ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এপ্রিল মাসে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে প্রত্যক্ষ সামরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তার জবাবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলমান থাকার মধ্যেই এই সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
রবিবার রাতে ইরান যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতে, এই পদক্ষেপ কৌশলগত জবাব হিসেবে নেওয়া হয়। হামলার পর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বলা হয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে। তবে উত্তর ইসরায়েলে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যার ফলে সীমিত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হামলাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলি বাহিনী পশ্চিম ও মধ্য ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে। ইরানের সংবাদ সংস্থা IRNA-এর তথ্য অনুযায়ী, তেহরান, তাবরিজ এবং ইসফাহানে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, ইসরায়েল আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। পাল্টা হামলার পর পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে ইরান রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়।
উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাব শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইরান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তার পশ্চিমাঞ্চলীয় আকাশসীমা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে ইরাক ৭২ ঘণ্টা এবং সিরিয়া ১২ ঘণ্টার জন্য তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে প্রভাব পড়েছে এবং বহু ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করতে হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে এবং তেল ও বাণিজ্যিক পরিবহন রুটও প্রভাবিত হতে পারে।
এই ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও সামনে এসেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
টানা দ্বিতীয় দিনের মতো এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বৈত নীতির অভিযোগ তুলেছে এবং বলেছে, মার্কিন নীতির কারণে আলোচনার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Donald Trump এই সংঘাত নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-এর কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে, বিশেষ করে যখন দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এদিকে, লেবাননের রাজধানী Beirut-এর দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় দুইজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। এই হামলা এমন সময়ে হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চলছিল। তবে Hezbollah ওই সমঝোতা গ্রহণ করেনি।
এই ঘটনাগুলো সমগ্র লেভান্ট অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
উত্তেজনার প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনেও পৌঁছেছে। ২০২৬ FIFA World Cup 2026-কে কেন্দ্র করে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল যুক্তরাষ্ট্রে সীমিত ভিসা শর্তের মুখোমুখি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলটিকে শুধু ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং একই দিনে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। এর ফলে দলটি তাদের বেস ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে Mexico-এ স্থানান্তর করেছে।
এই পরিস্থিতি খেলাধুলা ও রাজনীতির মধ্যকার ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক প্রভাবকেও সামনে এনেছে।








