ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার দেশ যুদ্ধের চাপের কাছে নতিস্বীকার করবে না এবং কূটনৈতিক আলোচনার পথও বন্ধ করবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি বলেন, ইরানের প্রধান অগ্রাধিকার জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের শান্তি নিশ্চিত করা।
পেজেশকিয়ানের মতে, ইরান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণ সতর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি আন্তর্জাতিক সংলাপ ও সমাধানের পথও খোলা রেখেছে। তিনি বলেন, কোনো ধরনের হুমকির সামনে নতি স্বীকার করা ইরানের নীতি নয়।
পশ্চিম এশিয়ায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পুনরায় উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই এই বক্তব্য এসেছে। বিভিন্ন ফ্রন্টে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা আবারও সামরিক সংঘর্ষের দিকে এগোচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনের অনুযায়ী, ইরান ইসরায়েলের দিকে প্রায় ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর জবাবে ইসরায়েল ইরানের সামরিক ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব সমগ্র পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারতীয় দূতাবাস এক পরামর্শে নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ইরান সফর এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে ইরানে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপদ বিকল্প বিবেচনা করতে এবং পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখতে বলা হয়েছে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এই পরামর্শ জারি করা হয়েছে।

এদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ঘোষণা করেছে যে তারা লোহিত সাগরে ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
এই ঘোষণার পর বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং তেল সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক শিপিং খাত এবং জ্বালানি মূল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও দেখা যাচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামে ধারাবাহিক ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৪ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে, আর ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৯১ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ প্রভাবিত হতে পারে।
এই অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে এবং বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধিদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা জুন মাসের শেষ নাগাদ কোনো বাস্তবসম্মত ফলাফলে পৌঁছাতে পারে।
যদিও বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে, তবুও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি বজায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচনা সফল হলে আঞ্চলিক উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
ওমানের সামুদ্রিক এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাগরিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং ওমান নৌবাহিনীর যৌথ অভিযানে জাহাজের সব ক্রু সদস্যকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়েছে যে পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুট এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
এদিকে দক্ষিণ ইরানে ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। হরমোজগান ও কেরমান প্রদেশে কম্পন অনুভূত হলেও প্রাথমিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে ইরান ও লেবানন নীতি নিয়ে মতপার্থক্যের আলোচনা চলছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী লেবানন-সংক্রান্ত নীতির বিষয়ে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রতিরোধ ও উত্তেজনা হ্রাসের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।








