ইরানে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কথিত পদত্যাগের খবর খারিজ করল প্রেসিডেন্ট দপ্তর

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কথিত পদত্যাগের দাবি প্রেসিডেন্ট দপ্তর প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা, ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম এবং লেবানন-ইসরায়েল উত্তেজনা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের কথিত পদত্যাগের খবর দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিসরে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনেইর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্টের দপ্তর এসব প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রতিবেদনগুলোতে দাবি করা হয়, কথিত পদত্যাগপত্রে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেছেন যে দেশের প্রকৃত ক্ষমতা এখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়নি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রচার বিভাগের উপপ্রধান সাইয়্যেদ মেহদি তাবাতাবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জনগণের সেবায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং পদত্যাগের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি বলেন, ইরানের জনগণ যেভাবে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, প্রেসিডেন্টও একইভাবে নিজের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পদত্যাগসংক্রান্ত খবর কেবল গুজব এবং এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রতিবেদনগুলোতে আরও দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইরানের সরকারকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক ক্ষেত্রে সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা আগের তুলনায় বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্লেষকদের মত হলো, যদি এসব দাবিতে কোনো সত্যতা থাকে, তবে তা ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। তবে ইরানি প্রশাসন এসব দাবিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য ইসমাইল কাউসারি বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনা মূলত চারটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত।

তিনি বলেন, প্রথম বিষয় হলো ভবিষ্যতে নতুন কোনো যুদ্ধ ঠেকাতে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, দ্বিতীয় বিষয় সাম্প্রতিক সংঘাতে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, তৃতীয় বিষয় হরমুজ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং চতুর্থ বিষয় ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

কাউসারি আরও দাবি করেন, পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার মূল এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন, ইরানের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কাঠামোতে পারমাণবিক কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত ও কঠোর বিধান রয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ওয়াশিংটন এখনও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে, অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে, যখন বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্কের একাধিক সুড়ঙ্গপথ পুনরায় সক্রিয় করেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী হামলার সময় একাধিক ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ব্যাপক খনন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণের কার্যক্রম দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনরায় সক্রিয় করতে সহায়তা করতে পারে।

ইরানসংক্রান্ত আঞ্চলিক পরিস্থিতির পাশাপাশি লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে একটি নতুন প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে।

সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাব অনুযায়ী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করতে পারে এবং এর বিনিময়ে ইসরায়েল বৈরুত ও অন্যান্য এলাকায় সামরিক অভিযান সীমিত করবে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর যুদ্ধ এড়ানো এবং স্থায়ী সমাধানের অনুকূল পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ লেবাননে অবস্থিত ঐতিহাসিক বেউফোর্ট দুর্গে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রান্স এ ঘটনাকে গুরুতর উল্লেখ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো বলেন, প্রতিটি দেশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে, তবে সামরিক অভিযানের বিস্তার আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, সংঘাত সম্প্রসারিত হলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।

ইরানে প্রেসিডেন্টের কথিত পদত্যাগের খবর, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা, ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম এবং লেবাননে বাড়তে থাকা সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও বৈশ্বিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যদিও একাধিক দাবির আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনও পাওয়া যায়নি, তবু অঞ্চলজুড়ে রাজনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

Leave a comment