কলকাতায় মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার অপসারণের কথিত মৌখিক নির্দেশকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী দাবি করেছেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁর কাছে অভিযোগ এসেছে যে স্থানীয় পুলিশ মসজিদ পরিচালনা কমিটিগুলিকে মৌখিকভাবে মাইক্রোফোন ও লাউডস্পিকার সরিয়ে নিতে বলেছে।
তাঁর দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলি এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশ বা সরকারি বিজ্ঞপ্তি চাইলে কোনো সরকারি নথি সরবরাহ করা হয়নি। তবে এই দাবির বিষয়ে প্রশাসন বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নওশাদ সিদ্দিকী বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে ফোন পাচ্ছেন, যেখানে জানানো হয়েছে যে পুলিশ আধিকারিকরা মসজিদ কমিটিগুলিকে ডেকে লাউডস্পিকার অপসারণের কথা বলেছেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ শুধুমাত্র মৌখিক নির্দেশ দিয়েছে এবং লিখিত আদেশ চাইলে কোনো নথি দেখানো হয়নি। তাঁর মতে, যেকোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপের ভিত্তি লিখিত আদেশ হওয়া উচিত, যাতে তার বৈধতা ও আইনগত অবস্থান স্পষ্ট থাকে।
ISF বিধায়ক বলেন, যদি প্রশাসন সত্যিই মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে এ বিষয়ে লিখিত বিজ্ঞপ্তি জারি করা উচিত। তাঁর বক্তব্য, সরকার বা পুলিশের কাছে যদি কোনো বৈধ নির্দেশ থাকে, তবে তা প্রকাশ্যে আনা হোক। অন্যথায় প্রশাসন যেন আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তাঁর মতে, শুধুমাত্র মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরঞ্জাম অপসারণের দাবি যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করা যায় না।
নওশাদ সিদ্দিকী এই ইস্যুতে সকলকে সংযম বজায় রাখার এবং প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তার সমাধান আইনগত উপায়ে করা উচিত। তিনি সমর্থকদের আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের উসকানি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
নিজের বক্তব্যে নওশাদ সিদ্দিকী বলেন, ভারতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্পষ্ট আইনগত বিধান রয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ শিল্পাঞ্চল, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং নীরব অঞ্চলগুলির জন্য পৃথক ডেসিবেল সীমা নির্ধারণ করেছে। তাঁর দাবি, অধিকাংশ মসজিদে নির্ধারিত শব্দসীমার মধ্যেই লাউডস্পিকার ব্যবহার করা হয়। তাঁর মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করলে পরিবেশ সুরক্ষা আইন, ১৯৮৬ এবং সংশ্লিষ্ট শব্দদূষণ বিধির অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, আইন সব ধর্মীয় ও জনসাধারণের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
ISF বিধায়ক জানান, প্রশাসন যদি এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশ জারি না করে এবং মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে পদক্ষেপ চালিয়ে যায়, তাহলে তাঁদের দল আদালতের দ্বারস্থ হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক (DGP)-এর কাছে ইমেলের মাধ্যমে অভিযোগও পাঠানো হয়েছে। দলের দাবি, পুরো বিষয়টির বিচারিক পর্যালোচনা হওয়া উচিত, যাতে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়।
ভারতে ধর্মীয় স্থানে লাউডস্পিকার ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদালতে শুনানি হয়েছে। উচ্চ আদালত এবং সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলায় জানিয়েছে যে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধি এবং জনশৃঙ্খলার শর্তাধীন। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মন) বিধি অনুযায়ী, লাউডস্পিকার ও জনসাধারণের ঘোষণাপদ্ধতি নির্ধারিত সময়, অনুমতি এবং ডেসিবেল সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। বিধি লঙ্ঘিত হলে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
এই বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। নওশাদ সিদ্দিকীর বক্তব্য, প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত হওয়া উচিত। অন্যদিকে, প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। সরকার বা পুলিশ এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করলে পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার অপসারণের কথিত মৌখিক নির্দেশের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য লিখিত আদেশ সামনে আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে। প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে, এটি সত্যিই কোনো বৃহত্তর প্রশাসনিক পদক্ষেপের অংশ কি না, নাকি শুধুমাত্র স্থানীয় পর্যায়ে দেওয়া নির্দেশের বিষয়।






