একসময় ঝুলন এলেই জমজমাট হয়ে উঠত কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির পুতুলপট্টি। মাটির তৈরি ছোট ছোট পুতুল কিনতে দূরদূরান্ত থেকে ভিড় করতেন ক্রেতারা। কিন্তু সেই ছবিটা এখন অনেকটাই অতীত। জিআই স্বীকৃতি মিললেও ঘূর্ণির ক্ষুদ্র মৃৎশিল্পীদের জীবনে যেন তার প্রভাব পড়েনি। বরং উৎসবের মরশুমেও পুতুল বিক্রি না হওয়ায় চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন শিল্পীরা।
একসময় ঝুলন মানেই পুতুলের রমরমা বাজার
ঘূর্ণির প্রায় ৩০ বছরের অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পী আনন্দ দাসের কথায়, কয়েক বছর আগেও ঝুলন উৎসবকে কেন্দ্র করে মাটির পুতুলের ব্যাপক চাহিদা ছিল।দেব-দেবীর মূর্তি থেকে গোপাল, বাউল-বাউলানি, কীর্তনের দৃশ্য, গ্রামবাংলার পরিবারের মডেল, রাজা-রানি কিংবা আদিবাসী জীবনের বিভিন্ন সেট—বৈচিত্র্যে ভরা ছিল কৃষ্ণনগরের পুতুলের সম্ভার।উৎসবের আগে থেকেই কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়ত। দোকানেও থাকত ক্রেতাদের ভিড়।
২০ টাকার পুতুলও এখন অবিক্রিত!
কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চেনা ছবি বদলে গিয়েছে। শিল্পীদের দাবি, ডিজিটাল বিনোদনের বাড়বাড়ন্তের পাশাপাশি বাজারে প্লাস্টিক, ফাইবার, মেটাল ও স্টোন ডাস্টের তৈরি পুতুল ও শোপিসের ব্যবহার বেড়েছে।ফলে মাটির পুতুলের চাহিদা কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। শিশুদের মধ্যেও আগের মতো মাটির পুতুল নিয়ে আগ্রহ নেই।পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, মাত্র ২০ টাকাথেকে শুরু হওয়া পুতুলও বিক্রি করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে দাবি শিল্পীদের।
সারাদিন দোকানে বসেও হচ্ছে না ‘বউনি’
শিল্পীদের বক্তব্য, কোনও কোনও দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে বসে থাকলেও প্রথম বিক্রিটুকু হচ্ছে না। অর্থাৎ ‘বউনি’ না হওয়ায় দিন কাটছে হতাশায়।পুতুল তৈরিতে সময়, শ্রম এবং কাঁচামালের খরচ রয়েছে। কিন্তু তৈরি পুতুল বিক্রি না হলে সেই খরচও উঠে আসছে না। ফলে শুধুমাত্র মৃৎশিল্পের উপর নির্ভর করে পরিবার চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
সংসার চালাতে টোটো, সবজি বিক্রি
আর্থিক সমস্যার কারণে ইতিমধ্যেই অনেক শিল্পী বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকেছেন। কেউ টোটো চালাচ্ছেন, আবার কেউ সবজি বিক্রি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেনযে হাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিখুঁত মাটির পুতুল তৈরি হয়েছে, সেই হাতেই এখন সংসারের প্রয়োজন মেটাতে অন্য কাজ করতে হচ্ছে।
পরবর্তী প্রজন্মও আর আসতে চাইছে না
শিল্পীদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে। এই পেশায় আয় অনিশ্চিত হওয়ায় শিল্পী পরিবারের অনেক তরুণ-তরুণী আর মৃৎশিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাইছেন না।ফলে শুধু বর্তমান শিল্পীরাই সমস্যায় পড়ছেন না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্পের ধারাবাহিকতাও প্রশ্নের মুখে।
জিআই স্বীকৃতি মিলল, কিন্তু লাভ কোথায়?
কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় শিল্পীদের প্রত্যাশা ছিল বাজারে চাহিদা বাড়বে এবং তাঁদের আয়ও বাড়বে। কিন্তু ক্ষুদ্র শিল্পীদের অভিযোগ, সেই স্বীকৃতির বাস্তব সুফল তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে এখনও যথেষ্টভাবে পৌঁছয়নি।তাঁদের দাবি, বড় শিল্পীদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা থাকলেও প্রান্তিক কারিগরদের সমস্যা নিয়ে আরও সক্রিয়ভাবে ভাবা প্রয়োজন।
কী চান মৃৎশিল্পীরা?
এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে শিল্পীরা সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রয়োজন—
মাটির পুতুলের জন্য আরও বড় বাজার তৈরি করা
সরকারি উদ্যোগে বিপণনের ব্যবস্থা করা
অনলাইন ও দেশ-বিদেশের বাজারে পুতুল পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা
ক্ষুদ্র শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া
জিআই স্বীকৃতির সুবিধা সরাসরি কারিগরদের কাছে পৌঁছে দেওয়া
নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পে উৎসাহিত করার ব্যবস্থা করা
কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির মাটির পুতুল বাংলার অন্যতম পরিচিত লোকশিল্প। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই শিল্পের কদর আরও বাড়ার আশা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই আলাদা। ঝুলন উৎসবের মরশুমেও বিক্রি তলানিতে। এমনকি ২০ টাকা দামের পুতুলও অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে বলে দাবি শিল্পীদের। সংসার চালাতে কেউ টোটো চালাচ্ছেন, কেউ আবার সবজি বিক্রি করছেন।










