তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। একটি অভিযোগ-সংক্রান্ত মামলায় একাধিক সমন সত্ত্বেও আদালতে হাজির না হওয়ার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে মামলাটি ভারতীয় সেনা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে একটি সাক্ষাৎকারে কথিত বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়। অভিযোগকারী দাবি করেন, সাক্ষাৎকারে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে এমন মন্তব্য করা হয়েছিল, যেগুলিকে আপত্তিকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, নদিয়ার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ দে কৃষ্ণনগর আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে কথিত আপত্তিকর ও রাষ্ট্রবিরোধী মন্তব্য করার অভিযোগ আনা হয়।
এই অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা এখনও আদালতে নির্ধারিত হয়নি।
মামলার শুনানির সময় আদালত মহুয়া মৈত্রকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, একাধিক সমন সত্ত্বেও তিনি আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র রিপোর্ট অনুযায়ী, আদালত একাধিকবার জারি করা বিচারিক নির্দেশ মেনে না চলার বিষয়টি বিবেচনা করে পরোয়ানা জারি করেছে।
নদিয়া পুলিশের কর্মকর্তারাও মহুয়া মৈত্রের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে প্রাথমিক রিপোর্টগুলিতে পরোয়ানার সঙ্গে যুক্ত মামলার সম্পূর্ণ আইনি অবস্থান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে পৃথক একটি মামলাও চলছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন মন্তব্য করার অভিযোগ রয়েছে।
এই মামলায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা দিয়েছিল। আদালত পুলিশকে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রেখে মহুয়া মৈত্রকে তদন্তে সহযোগিতা করা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়।
পরে এই মামলায় মহুয়া মৈত্র সুপ্রিম কোর্টেরও দ্বারস্থ হন। আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে এবং তাঁকে তদন্তে অংশ নেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, একটি সাক্ষাৎকারে মহুয়া মৈত্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এমন ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী আপত্তি জানান।
মিডিয়া রিপোর্টে অভিযোগকারীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, মহুয়া মৈত্র ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং কথিত আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয়।
কোনও মন্তব্য আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা আদালতে অভিযোগ এবং উপলব্ধ প্রমাণ পরীক্ষা করার পরই নির্ধারিত হবে।
রাজনীতিতে আসার আগে মহুয়া মৈত্র বিনিয়োগ ব্যাংকিং ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। পরে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হন।
২০১৬ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের করিমপুর বিধানসভা আসন থেকে নির্বাচনে জয়ী হন। এরপর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর আসন থেকে জয়ী হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও তিনি কৃষ্ণনগর আসন থেকে জয়ী হন।
২০২৩ সালে মহুয়া মৈত্র ‘ক্যাশ ফর কোয়েরি’ মামলায় অভিযোগের মুখে পড়েন। সংসদের এথিক্স কমিটির রিপোর্টের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লোকসভা তাঁর সদস্যপদ বাতিল করে।
এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি কৃষ্ণনগর আসন থেকে ফের জয়ী হন এবং সংসদে ফিরে আসেন।
গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। এটি আদালতের জারি করা একটি আইনি আদেশ, যার মাধ্যমে পুলিশকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতের সামনে হাজির করার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এই মামলাতেও মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হবে।
এখন মামলায় পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে মহুয়া মৈত্র আদালতের সামনে কীভাবে হাজির হন এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে আদালত পরবর্তী কী নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি, বিতর্কিত মন্তব্য সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও শুনানিও এগিয়ে চলবে।










