রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনের সুমি শহরে ভারত-সংযুক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি কুসুম গ্রুপের উৎপাদন ইউনিটে রুশ ড্রোন হামলা হয়েছে। হামলায় এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। কোম্পানির প্রধান উৎপাদন ভবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোম্পানির হিসাবে, ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ কোটি রুপির বেশি হতে পারে।
ঘটনাটি ৪ অক্টোবর সুমিতে রুশ ড্রোন হামলার সময় ঘটে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ এবং কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, কুসুম গ্রুপের ফার্মাসিউটিক্যাল কমপ্লেক্স হামলার শিকার হয়। হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ইউক্রেনীয় পক্ষ এটিকে নাগরিক ও চিকিৎসা সরবরাহ-সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর ওপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কুসুম গ্রুপের শিকড় ভারতের সঙ্গে যুক্ত। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান রাজীব গুপ্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী। হামলার সময় তিনি সুমিতে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে। রাজীব গুপ্ত ভারতের রাজস্থানের ভরতপুরের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী।
কুসুম গ্রুপ প্রথমে ভারত থেকে ইউক্রেনে ওষুধ পাঠানো এবং সেগুলির বিতরণের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে। পরে কোম্পানি বিতরণের পাশাপাশি নিজস্ব ওষুধ উৎপাদনে যায়। কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট উপলভ্য তথ্য অনুযায়ী, ভারতে উৎপাদন ইউনিট স্থাপনের পর ২০০৯ সালে ইউক্রেনের সুমিতে একটি উৎপাদন কারখানা চালু করা হয়।
কোম্পানির ব্যবসা মূলত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। রিপোর্ট অনুযায়ী, কুসুম গ্রুপ ৫০টিরও বেশি ওষুধ উৎপাদন করে এবং ইউক্রেনের পাশাপাশি মধ্য এশিয়া ও অন্যান্য বিদেশি বাজারেও ওষুধ সরবরাহ করে। ভারতে কোম্পানির উৎপাদন পরিকাঠামো রাজস্থানের ভিওয়াড়ি এবং মধ্যপ্রদেশের পিথমপুরেও রয়েছে। কুসুম গ্রুপ জানিয়েছে, ইউক্রেনে ওষুধের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে ভারতের উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করা যেতে পারে।
সুমি ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চল, যেখানে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ৪ অক্টোবরের হামলায় কুসুম গ্রুপের ওষুধ উৎপাদন ইউনিট গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, ড্রোন হামলার পর কারখানার মূল কাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী দেখা যায়।
কুসুম গ্রুপ জানিয়েছে, নিহত কর্মী ইয়েভহেন ভোলোদিমিরোভিচ মিরোশনিচেঙ্কো ২০০৯ সাল থেকে কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে কাজ করছিলেন। কোম্পানি তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।
ড্রোন হামলায় কোম্পানির সুমি ইউনিটে বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্টে ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৪০০ কোটি রুপি বা প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান উৎপাদন পরিকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হওয়ায় ইউক্রেনে কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যেও কারখানাটিতে উৎপাদন চলছিল, তবে সাম্প্রতিক হামলার পর স্বাভাবিক কার্যক্রম গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।
কোম্পানি অবশ্য জানিয়েছে, তাদের ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। ভারতে থাকা উৎপাদন ইউনিটগুলির সহায়তায় ইউক্রেনে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে।
হামলায় নিহত কর্মীকে প্রাথমিক মিডিয়া রিপোর্টে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে কোম্পানি জানায়, তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে যুক্ত কর্মী ছিলেন।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের মতে, ৪ অক্টোবর থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে সুমি অঞ্চলে একাধিক রুশ হামলা হয়েছে। আঞ্চলিক প্রশাসন ২৪ ঘণ্টায় কয়েক ডজন হামলার কথা জানিয়েছে এবং সুমি কমিউনিটিতে এক ব্যক্তির মৃত্যু ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ঘটনাটি ইউক্রেনের একাধিক শহর ও পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো বৃহত্তর রুশ বিমান অভিযানের অংশ ছিল।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সুমিতে ফার্মাসিউটিক্যাল স্থাপনায় হামলার কথা উল্লেখ করে নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। ইউক্রেনীয় পক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় ওষুধের উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা হতো। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা হামলাটিকে নাগরিক পরিকাঠামোর ওপর রুশ হামলার বৃহত্তর ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে কোনও হামলার সামরিক উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা প্রায়ই কঠিন। ফলে হামলার পেছনে রাশিয়ার প্রকৃত পরিচালনাগত উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারি তদন্তের পরই নেওয়া সম্ভব হবে।
কুসুম গ্রুপের ইউক্রেনের কার্যক্রমে এর আগেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিলে কোম্পানির একটি গুদামও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাম্প্রতিক হামলায় সুমির প্রধান উৎপাদন স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং একজন কর্মীর মৃত্যু হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়েছে।
কুসুম গ্রুপের সুমি ইউনিট জেনেরিক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন স্থানীয় ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। যুদ্ধের মধ্যে স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে নাগরিক স্থাপনা এবং চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট হামলায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন তথ্য-যাচাই ও আইনি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন ভারত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সম্প্রতি বলেছেন, সংঘাতের সমাধানে ভারত তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছে এবং মস্কো ও কিয়েভ—উভয়ের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধান আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে হওয়া উচিত—এটাই ভারতের দীর্ঘদিনের সরকারি অবস্থান। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বংশোদ্ভূত একটি কোম্পানির সম্পত্তিতে হামলার ঘটনা নয়াদিল্লির জন্য অর্থনৈতিক ও মানবিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেনে কার্যরত ভারতীয় কোম্পানি এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীদের জন্য এই হামলা যুদ্ধজনিত নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে শিল্প ইউনিট পরিচালনার ক্ষেত্রে লজিস্টিকস, কর্মীদের নিরাপত্তা, বিমা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
কুসুম গ্রুপের ক্ষেত্রে ভারতে থাকা উৎপাদন ইউনিটগুলি বিকল্প সরবরাহ সক্ষমতা দিতে পারে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার পরও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা সম্ভব হতে পারে। সুমি কারখানাটি পুরোপুরি পুনরায় চালু হতে কত সময় লাগবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।







