পর্দায় তাঁর সংলাপ যেমন তীব্র ছিল, তেমনই বাস্তব জীবনও ছিল নানা ওঠাপড়ায় ভরা। বিশ্বনাথ পাটেকর থেকে ‘নানা পাটেকর’ হয়ে ওঠার পথ একেবারেই সহজ ছিল না। মাত্র ৫০ টাকা বেতন দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। বিয়েতে খরচ করেছিলেন মাত্র ৭৫০ টাকা। পরে অভিনয়ের জগতে একের পর এক স্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়ে জাতীয় স্তরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছিল বড় আঘাত—সন্তান হারানোর যন্ত্রণা। ৮ অক্টোবর তাঁর প্রয়াণের পর ফের সামনে এসেছে সেই লড়াইয়ের গল্প।
ছোট বোনের দেওয়া ডাকনামেই বদলে গেল পরিচয়
১৯৫১ সালে জন্মেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। ছোটবেলায় তাঁর ছোট বোন আদর করে তাঁকে ‘নানা’ বলে ডাকতেন। সেই পারিবারিক ডাকনামই পরবর্তীতে তাঁর পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।সিনেমার দুনিয়ায় পা রাখার পর ‘বিশ্বনাথ পাটেকর’ নামটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘নানা পাটেকর’—একটি নাম, যা পরবর্তীতে ভারতীয় অভিনয় জগতের অন্যতম শক্তিশালী পরিচয়ে পরিণত হয়।
মাত্র ৫০ টাকা বেতন, ৭৫০ টাকায় বিয়ে
খ্যাতির শীর্ষে ওঠার আগে নানা পাটেকরের জীবন ছিল যথেষ্ট সাধারণ। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তাঁর বেতন ছিল মাত্র ৫০ টাকা। অর্থাভাবের সেই সময়েও জীবনযাপনে সরলতাই ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।১৯৭৮ সালে থিয়েটার শিল্পী নীলকান্তি পাটেকর-কে বিয়ে করেন নানা। সেই বিয়েতেও ছিল না কোনও জাঁকজমক। মাত্র ৭৫০ টাকা খরচ করেই বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়।পরবর্তীতে কয়েক দশক ধরে ভারতীয় সিনেমায় কাজ করলেও নিজের জীবনযাপনে এই সাধারণ স্বভাবের ছাপ তিনি ধরে রেখেছিলেন।
থিয়েটার থেকে বলিউড—নিজের অভিনয়ভাষা তৈরি করেছিলেন
থিয়েটার থেকেই অভিনয়ের ভিত তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকর। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে এসে তাঁর অভিনয়ের ধরন দ্রুত নজর কাড়ে। তীব্র অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি এবং চরিত্রের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক অভিনেতাদের থেকে আলাদা করে দেয়।'পরিন্দা', 'ক্রান্তিবীর', 'অগ্নি সাক্ষী', 'খামোশি'-সহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পায়। তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল 'প্রহার'।
'প্রহার'-এর জন্য সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন
১৯৯১ সালে নিজের পরিচালিত 'প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক' ছবিতে সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নানা পাটেকর। চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন।একজন অভিনেতা চরিত্রের জন্য কতটা প্রস্তুতি নিতে পারেন, তাঁর এই অধ্যায় তারই উদাহরণ। অভিনয়ের ক্ষেত্রে বাস্তবতার প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতাই তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল।
সাফল্যের আড়ালেও ছিল সন্তান হারানোর যন্ত্রণা
নানা পাটেকরের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা বেদনায় ভরা। কেরিয়ারের শুরুর সময়েই জ্যেষ্ঠ সন্তানকে হারানোর গভীর শোক তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল।পরে তাঁর জীবনে আসে ছোট ছেলে মলহার পাটেকর। বর্তমানে মলহারও চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সন্তান হারানোর সেই পুরনো যন্ত্রণা এবং পরবর্তীতে পরিবারের নতুন আনন্দ—দুই অভিজ্ঞতাই নানা পাটেকরের ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজসেবাতেও ছিলেন সক্রিয়
শুধু সিনেমার পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও নানা পাটেকরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল সমাজসেবী হিসেবে। মহারাষ্ট্রের কৃষক ও খরাপ্রবণ এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে 'নাম ফাউন্ডেশন'-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।কৃষকদের সহায়তা, জল সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির মতো নানা কাজে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। নিজের উপার্জনের একটি অংশও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন নানা।
জাতীয় পুরস্কার থেকে পদ্মশ্রী—স্বীকৃতির দীর্ঘ তালিকা
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মান পেয়েছেন। তাঁর অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়াও ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।হিন্দি ও মারাঠি—দুই ভাষার সিনেমাতেই নিজের শক্তিশালী অভিনয় দিয়ে তিনি আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্যই তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে।
নানা পাটেকরের প্রয়াণে ভারতীয় সিনেমায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ায় প্রয়াত হন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তবে তাঁর মৃত্যুর খবরের পাশাপাশি ফিরে আসছে সংগ্রামে ভরা জীবনের গল্পও। ৫০ টাকা বেতন থেকে কর্মজীবন শুরু, মাত্র ৭৫০ টাকায় বিয়ে, সন্তান হারানোর গভীর যন্ত্রণা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর, যাঁকে গোটা দেশ চিনেছে ‘নানা পাটেকর’ নামে।








