NASA আনুষ্ঠানিকভাবে MAVEN মঙ্গল অরবিটার মিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করল

NASA আনুষ্ঠানিকভাবে MAVযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মহাকাশযানটির সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। ১১ বছর ধরে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ু সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহকারী এই মিশনের ডেটা ভবিষ্যতের গবেষণায় ব্যবহৃত হবে।

মার্স অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড ভোলাটাইল ইভোলিউশন (MAVEN) মিশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা NASA। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মহাকাশযানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পুনরুদ্ধারের জন্য একাধিক প্রচেষ্টা চালানো হলেও তা সফল হয়নি। প্রায় ১১ বছর ধরে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে গবেষণা চালানো এই অরবিটারটি এখন স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

NASA ২০১৩ সালের নভেম্বরে MAVEN মিশন উৎক্ষেপণ করে এবং ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এটি সফলভাবে মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করে। মিশনের প্রধান লক্ষ্য ছিল কয়েকশ কোটি বছর আগে তুলনামূলকভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশযুক্ত মঙ্গল গ্রহ কীভাবে সময়ের সঙ্গে শুষ্ক ও শীতল হয়ে উঠেছে, তা বোঝা।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশযানটি মঙ্গলের উচ্চ বায়ুমণ্ডল, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সৌর কার্যকলাপের প্রভাব সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেছে। মিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিজ্ঞানীদের গ্রহটির বিবর্তন এবং এর বায়ুমণ্ডলে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করেছে।

NASA-এর তথ্য অনুযায়ী, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে MAVEN তার নিয়মিত কক্ষপথীয় চক্রের অংশ হিসেবে মঙ্গল গ্রহের আড়ালে চলে যায়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল এবং পূর্বের মতোই গ্রহের অন্য প্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসার পর মহাকাশযানটির সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনের কথা ছিল।

তবে এবার তা সম্ভব হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত বৃহৎ রেডিও অ্যান্টেনা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী NASA-এর ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক MAVEN-এর কাছ থেকে কোনো সংকেত পায়নি। এরপর বিজ্ঞানীরা ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা চালালেও কোনো সাড়া মেলেনি।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর NASA ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সমস্যার কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। কয়েক মাসের তদন্ত শেষে সংস্থাটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে মহাকাশযানটিকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।

তদন্তে প্রাপ্ত সীমিত টেলিমেট্রি তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে MAVEN-এর ঘূর্ণন গতি হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে ব্যাটারির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং শক্তি দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে।

NASA-এর ধারণা, ব্যাটারির শক্তির মাত্রা অত্যন্ত কমে যাওয়ার পর যোগাযোগ ব্যবস্থা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে মহাকাশযানটি পৃথিবীতে কোনো সংকেত পাঠাতে পারেনি এবং যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

মঙ্গল গবেষণার ইতিহাসে MAVEN মিশনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মিশন প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করে যে সূর্য থেকে আগত আধানযুক্ত কণাগুলো মঙ্গলের উচ্চ বায়ুমণ্ডলের গ্যাস ধীরে ধীরে মহাশূন্যে সরিয়ে নিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় “স্পাটারিং” বলা হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রক্রিয়াই মঙ্গলের ঘন বায়ুমণ্ডল ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া মিশনটি মঙ্গলে পর্যবেক্ষিত বিভিন্ন ধরনের অরোরা কার্যকলাপও অধ্যয়ন করেছে এবং গ্রহটির চৌম্বকীয় পরিবেশের ওপর সৌর ঝড়ের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে।

NASA জানিয়েছে, মহাকাশযানটি আর সক্রিয় না থাকলেও এর সংগ্রহ করা বিপুল তথ্যভাণ্ডার আগামী বছরগুলোতেও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত হবে। সম্প্রতি MAVEN-এর তথ্যের সহায়তায় মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে একটি নতুন এবং পূর্বে অজানা প্রাকৃতিক ঘটনারও শনাক্তকরণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, MAVEN মিশন মঙ্গল গ্রহের ইতিহাস, এর বায়ুমণ্ডল এবং সেখানে জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১১ বছর ধরে কার্যক্রম চালানোর পর মিশনটি শেষ হলেও এর বৈজ্ঞানিক অর্জন ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযান ও গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

 

Leave a comment