বেইজিং বৈঠকে কালাপানি-লিপুলেখ ইস্যু উত্থাপন করল নেপাল, দ্বিপাক্ষিক সমাধানের পক্ষে চীন

বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে নেপাল কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা ও লিপুলেখ সংক্রান্ত সীমান্ত বিরোধ উত্থাপন করেছে। চীন বিষয়টিকে ভারত-নেপালের দ্বিপাক্ষিক ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

নেপাল আবারও ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা এবং লিপুলেখ অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খনাল চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সামনে বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং ভারত ও চীনের মধ্যে লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহারের বিষয়ে হওয়া চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই বিরোধ আবারও হিমালয় অঞ্চলের কৌশলগত ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতাকে সামনে এনেছে।

গত ১৫ জুন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খনাল বলেন, কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা এবং লিপুলেখ অঞ্চল নেপালের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ। তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর কাছে প্রশ্ন তোলেন যে ভারত ও চীনের মধ্যে লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহারের যে চুক্তি হয়েছে, তা কোন ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং এর আইনি ও কূটনৈতিক প্রকৃতি কী।

এর জবাবে ওয়াং ই বলেন, বিষয়টি মূলত ভারত ও নেপালের মধ্যকার একটি দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত বিরোধ এবং এর সমাধান শুধুমাত্র আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব। তিনি কোনো পক্ষের প্রতি সরাসরি সমর্থন না জানিয়ে বিষয়টিকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পরিসরে রাখেন।

এই বিরোধের সূত্র ২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে হওয়া একটি চুক্তির সঙ্গে যুক্ত, যেখানে লিপুলেখ গিরিপথের মাধ্যমে কৈলাস মানসসরোবর যাত্রা এবং সীমান্তপারের বাণিজ্য পুনরায় শুরু করার বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল। এই পথ ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।

চুক্তির পর নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানায়। নেপালের দাবি, লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা তার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ভূখণ্ডের অংশ। তাই নেপালের সম্মতি ছাড়া এ ধরনের কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কাঠমান্ডু এ বিষয়ে ভারত ও চীন উভয় দেশের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিল।

নেপাল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে বিতর্কিত অঞ্চলটি তার সার্বভৌম সীমার মধ্যে পড়ে। নেপালের মতে, ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি অনুযায়ী কালী নদীর পশ্চিমাঞ্চল নেপালের অংশ। তবে নদীর উৎস নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। নেপাল আরও বলেছে, তার সম্মতি ছাড়া কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে এই অঞ্চল সম্পর্কিত চুক্তি আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী। এ কারণে দেশটি বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক আপত্তি জানিয়েছে।

ভারত এই পুরো অঞ্চলকে তার সার্বভৌম সীমার অংশ বলে মনে করে এবং লিপুলেখ গিরিপথকে ঐতিহাসিক বাণিজ্য ও ধর্মীয় যাত্রার একটি প্রচলিত পথ হিসেবে উল্লেখ করে। ভারতের মতে, এই পথ বহু শতাব্দী ধরে কৈলাস মানসসরোবর যাত্রার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। লিপুলেখ গিরিপথ কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভারত, নেপাল ও চীনের সীমান্তের নিকটে অবস্থিত। নিরাপত্তা ও বাণিজ্য—উভয় ক্ষেত্রেই অঞ্চলটি সংবেদনশীল বলে বিবেচিত।

চীন এই বিরোধে নিজেকে সরাসরি পক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। বেইজিং ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে এটি ভারত ও নেপালের মধ্যকার বিষয় এবং এর সমাধান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। চীন এই অবস্থান বজায় রেখেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-চীন সীমান্তের লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে বাণিজ্য পুনরায় চালুর প্রস্তুতিও জোরদার হয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকা সংঘর্ষের পর এই পথ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ছয় বছর পর এটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় অঞ্চল থেকে প্রায় ৩০০ ব্যবসায়ীর নাম ট্রেড পাসের মাধ্যমে তিব্বতের তাকলাকোট বাজারে যাওয়ার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির মাধ্যমে নেপাল ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। চুক্তিতে কালী নদীকে সীমারেখা হিসেবে ধরা হয়। বিরোধের মূল বিষয় হলো কালী নদীর প্রকৃত উৎস কোথায়। ভারত নদীর পূর্বাঞ্চলীয় ধারাকে উৎস হিসেবে বিবেচনা করে, অন্যদিকে নেপাল পশ্চিমাঞ্চলীয় ধারাকে প্রকৃত উৎস বলে দাবি করে। এই ভৌগোলিক মতপার্থক্যের কারণেই কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা এবং লিপুলেখ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

এই বিরোধ কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ভারত, নেপাল এবং চীনের স্বার্থ জড়িত। হিমালয় অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা, সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যপথ পুনরায় চালুর উদ্যোগ বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল সময়ে সময়ে এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্থাপন করে, অন্যদিকে ভারত ও চীন বিষয়টিকে দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যেই রাখতে চায়।

 

Leave a comment