১৯৪৩ সালে জার্মানি থেকে জাপান পর্যন্ত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাবমেরিন যাত্রা

১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তাঁর সহযোগী আবিদ হাসানের জার্মানি থেকে জাপান পর্যন্ত সাবমেরিন যাত্রার বিবরণ, যেখানে অভিযানের তারিখ, ব্যবহৃত জার্মান ও জাপানি সাবমেরিন, স্থানান্তর প্রক্রিয়া এবং সাবাংয়ে পৌঁছানোর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জার্মানি থেকে জাপান পর্যন্ত সাবমেরিন যাত্রা একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ অভিযান ছিল, যেখানে সীমিত স্থান, দমবন্ধ করা পরিবেশ এবং সমুদ্রপথের ঝুঁকির মধ্যেও তিনি সংযম, শৃঙ্খলা এবং সুস্পষ্ট লক্ষ্য বজায় রেখে অগ্রসর হন। এই যাত্রা তাঁর নেতৃত্ব, পরিকল্পনা এবং দেশের স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্জনের প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

১৯৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জার্মানির কিল বন্দরে এই অভিযান শুরু হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তাঁর সহযোগী আবিদ হাসান জার্মান সাবমেরিন ইউ-১৮০-এ যাত্রা করেন, যা পরে জাপানি সাবমেরিন আই-২৯ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ করা।

সাবমেরিনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও দমবন্ধ করা। সরু করিডর, পাইপ এবং যন্ত্রপাতির মধ্যে চলাচল কঠিন ছিল। ডিজেলের তীব্র গন্ধ, ধাতব দেয়াল এবং কৃত্রিম আলোর কারণে দিন ও রাতের পার্থক্য বোঝা যেত না। এই পরিস্থিতিতে মানসিক স্থিরতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।

খাদ্য ও বিশ্রামও ছিল সীমিত। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণযোগ্য টিনজাত খাবার ও শক্ত রুটির পাশাপাশি আবিদ হাসান নেতাজির জন্য চাল-ডালের খিচুড়ির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থাপনা কঠিন পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণের একটি দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিরাপত্তার কারণে সাবমেরিনটি অধিকাংশ সময় সমুদ্রের নিচে অবস্থান করত, যাতে শত্রুপক্ষের নজর এড়ানো যায়। রাতের বেলা ভূপৃষ্ঠে উঠে ব্যাটারি চার্জ ও বায়ুচলাচলের ব্যবস্থা করা হতো। এই সময় শত্রু জাহাজের ঝুঁকিও ছিল। এমন পরিস্থিতিতেও নেতাজি তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে অভিযানের কৌশল নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যান।

সমুদ্রপথে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকা তাঁর জন্য মানসিকভাবে কঠিন ছিল, তবে অভিযানের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি নিজেকে স্থির রাখেন।

১৯৪৩ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আবিদ হাসানকে জার্মান ইউ-১৮০ থেকে জাপানি সাবমেরিন আই-২৯-এ স্থানান্তর করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠে ঢেউ ও ঝুঁকির মধ্যেই রাবারের নৌকার মাধ্যমে এই স্থানান্তর সম্পন্ন হয়, যা দুই দেশের সামরিক সমন্বয়ের অংশ ছিল।

জাপানি সাবমেরিনে ভারতীয় মশলাসহ খাবার এবং কেবিনে নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা করা হয়। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা ও যোগাযোগের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও অভিযানের লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকে।

১৯৪৩ সালের ১৩ মে আই-২৯ সুমাত্রার উত্তর উপকূলের কাছে সাবাংয়ে পৌঁছায়। সেখান থেকে নেতাজির রাজনৈতিক ও সামরিক কার্যক্রম পূর্ব এশিয়া থেকে ভারতের জন্য সমর্থন ও প্রেরণা সংগ্রহের দিকে অগ্রসর হয়। এই সময়ে রেডিওর মাধ্যমে তাঁর বার্তা ভারতবাসীর কাছে সম্প্রচারিত হতে থাকে।

এই সমগ্র যাত্রায় লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, চাপের মধ্যে স্থিরতা এবং শৃঙ্খলার বিষয়গুলি ধারাবাহিকভাবে উপস্থিত ছিল।

 

Leave a comment