পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানের কুনার, খোস্ত ও পাক্তিকা প্রদেশে এই বিমান হামলা চালানো হয়। হামলায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, পাকিস্তানের বিমান হামলায় সরাসরি আবাসিক এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলায় মোট ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ শিশু, একজন নারী এবং একজন প্রবীণ ব্যক্তি রয়েছেন। এছাড়া ১৪ জন নারী গুরুতর আহত হয়েছেন।
তালেবান প্রশাসনের দাবি, হামলাগুলো সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক এলাকাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে এবং এতে বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ছবিতে ধ্বংসস্তূপ, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিস্থিতি দেখা গেছে। তবে এসব ছবি ও হতাহতের পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তালেবান প্রশাসন ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছে। তাদের মতে, কোনো পরিস্থিতিতেই বেসামরিক এলাকায় এ ধরনের সামরিক অভিযান গ্রহণযোগ্য নয়।
বিমান হামলার সবচেয়ে বেশি প্রভাব আফগানিস্তানের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পড়েছে। বিশেষ করে কুনার প্রদেশের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার কথা জানা গেছে।
খোস্ত ও পাক্তিকা প্রদেশেও একাধিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সামনে এসেছে। এসব অঞ্চলের অবকাঠামো আগে থেকেই দুর্বল বলে বিবেচিত হওয়ায় সামরিক অভিযানের প্রভাব ব্যাপক হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দুর্গম অবস্থান এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে আহতদের সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে বলেও জানা গেছে।

ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালায়। পাকিস্তান সরকারের দাবি, সীমান্তপারের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য হুমকি বেড়েছে।
পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে দেশের অন্যতম প্রধান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে। একইভাবে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-কেও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে। পাকিস্তানের দাবি, এসব সংগঠন আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে, ফলে তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মতে, সাম্প্রতিক অভিযান সীমান্তপারের হুমকির জবাব হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত সামরিক তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
কাবুলভিত্তিক তালেবান প্রশাসন পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এটি আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং কোনো দেশের এভাবে আফগান আকাশসীমা ব্যবহার করার অধিকার নেই।
তালেবান মুখপাত্র বলেছেন, পাকিস্তানের সামরিক অভিযান আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার ঘাটতিকে আরও গভীর করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত এক বছরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পরিচালিত একাধিক অভিযানে বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তালেবান প্রশাসনের দাবি, আফগানিস্তান সবসময় আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে, তবে সীমান্তপারের হামলা শান্তি প্রচেষ্টাকে দুর্বল করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার পর বহু পরিবার নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে। স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাণ ও চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আহত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে, যা ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত বিরোধ, শরণার্থী সংকট এবং নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিদ্যমান। পাকিস্তান বলে থাকে যে একটি স্থিতিশীল ও সহযোগিতামূলক আফগানিস্তান তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে আফগানিস্তান বারবার তার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
সীমান্ত অঞ্চলে সময়ে সময়ে সংঘর্ষ এবং বিমান হামলা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। কূটনৈতিক আলোচনা একাধিকবার শুরু হলেও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো যায়নি।
আন্তর্জাতিক মহল উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে আসছে। সীমান্তপারের সংঘাত বাণিজ্যপথ, শরণার্থী প্রবাহ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।








