আজ পঙ্কজ ত্রিপাঠীর নাম শুনলেই মনে পড়ে যায় একের পর এক শক্তিশালী চরিত্রের কথা। বড় পর্দা থেকে ওটিটি—সব জায়গাতেই নিজের অভিনয়ের ছাপ ফেলেছেন তিনি। কিন্তু এই সাফল্যের পিছনে ছিল দীর্ঘ লড়াই। বিহারের সাধারণ কৃষক পরিবারের ছেলে পঙ্কজকে অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে একসময় রাতের শিফটে হোটেলে কাজ করতে হয়েছে। দিনের বেলা থিয়েটার আর রাতে চাকরি—এই কঠিন রুটিনই ছিল তাঁর জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিহারের গ্রাম থেকে অভিনয়ের স্বপ্ন
১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার বেলসন্দ গ্রামে জন্ম পঙ্কজ ত্রিপাঠীর। তাঁর বাবা ছিলেন কৃষক এবং পুরোহিত। খুব সাধারণ পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
ছোটবেলা থেকেই গ্রামের নাটক ও অভিনয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় পঙ্কজের। স্কুলে পড়ার সময় নাটকে অংশ নিতেন তিনি। পরবর্তীতে পাটনায় একটি নাটক দেখার পর অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়।
রাতে হোটেলে চাকরি, দিনে থিয়েটার
অভিনয়কে পেশা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বাস্তব পরিস্থিতি তাঁর সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অভিনয় থেকে তখন সংসার চালানোর মতো আয় ছিল না। তাই ১৯৯৬ সাল থেকে থিয়েটারের পাশাপাশি অন্য কাজও করতে শুরু করেন তিনি।রাতে হোটেলের রান্নাঘরে কাজ করতেন পঙ্কজ। আর দিনের বেলা থিয়েটারে অভিনয় করতেন। প্রায় দু’বছর ধরে এমন কঠিন জীবনযাপন করতে হয়েছিল তাঁকে।রাতের শিফট শেষ করে অল্প সময় ঘুমিয়ে আবার নাটকের মহড়া ও অভিনয়ে চলে যেতেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত থিয়েটার করার পর ফের শুরু হত রাতের চাকরি। স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রমকেই সঙ্গী করেছিলেন তিনি।
অভিনয়ের জন্য বেছে নিলেন ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা
পঙ্কজের লক্ষ্য ছিল ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা বা NSD-তে পড়াশোনা করা। অভিনয়ের জন্য কোনও দামি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না।একাধিকবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর অবশেষে ২০০১ সালে NSD-তে সুযোগ পান তিনি। সেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০০৪ সালে মুম্বইয়ের উদ্দেশে রওনা হন।
মুম্বইয়ে এসে হাতে পড়ে মাত্র ১০ টাকা!
মুম্বইয়ে পা রাখার পরও তাঁর ভাগ্য রাতারাতি বদলে যায়নি। ২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর প্রায় ৪৬ হাজার টাকা নিয়ে স্বপ্নের শহরে এসেছিলেন পঙ্কজ।কিন্তু শহরে থাকার খরচ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে খুব দ্রুত সেই সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। একটা সময় তাঁর হাতে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ১০ টাকা। তবুও অভিনয়ের স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি।
ছোট চরিত্র দিয়েই শুরু বলিউড সফর
মুম্বইয়ে প্রথম দিকে বড় চরিত্র পাওয়ার সুযোগ হয়নি। ছোট ছোট ভূমিকায় অভিনয় করেই ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে থাকেন পঙ্কজ।
‘রান’, ‘অপহরণ’, ‘ওমকারা’, ‘শৌর্য’, ‘রাবণ’ এবং ‘অগ্নিপথ’-এর মতো ছবিতে তাঁকে ছোট চরিত্রে দেখা যায়। পাশাপাশি টেলিভিশনেও অভিনয় করেছেন তিনি।
তবে ২০১২ সালে ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও চলচ্চিত্র মহলের নজর কাড়ে।
‘মির্জাপুর’ থেকে ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’—জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে
এরপর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে অভিনয় করেন পঙ্কজ ত্রিপাঠী। ‘ফুকরে’, ‘মাসান’, ‘নীল বাট্টে সান্নাটা’, ‘বেরেলি কি বরফি’, ‘স্ত্রী’ এবং ‘লুডো’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়।ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ‘মির্জাপুর’ এবং ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস’-এর মতো সিরিজে অভিনয় করে তিনি নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও অত্যন্ত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
চরিত্রের বৈচিত্র্যই পঙ্কজের শক্তি
পঙ্কজ ত্রিপাঠীর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর চরিত্র বাছাই। একই ধরনের ভূমিকায় নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি।কখনও সাধারণ মানুষের চরিত্র, কখনও ভয়ঙ্কর বা নেতিবাচক চরিত্র, আবার কখনও আবেগঘন চরিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়ের ধরনই দর্শকদের সঙ্গে চরিত্রগুলির সহজ যোগাযোগ তৈরি করেছে।
জাতীয় পুরস্কারেও স্বীকৃতি
দীর্ঘদিনের অভিনয়যাত্রায় একাধিক সম্মান পেয়েছেন পঙ্কজ ত্রিপাঠী। তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন।যে মানুষটি একসময় জীবিকা নির্বাহের জন্য রাতে হোটেলে কাজ করতেন এবং মুম্বইয়ে এসে মাত্র ১০ টাকা নিয়ে কঠিন সময় পার করেছিলেন, তিনিই আজ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম পরিচিত অভিনেতা।
একসময় সংসার চালাতে রাতে হোটেলের রান্নাঘরে কাজ করতেন তিনি, আর দিনের আলো ফুটলেই ছুটতেন থিয়েটারে। অভিনয়ের স্বপ্ন চোখে নিয়ে বিহারের গ্রাম থেকে মুম্বইয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন। একসময় শহরে এসে হাতে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ১০ টাকা। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে আজ তিনি বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রশংসিত অভিনেতা—তিনি পঙ্কজ ত্রিপাঠী।









