রেখা শুধু বলিউডের গ্ল্যামারাস তারকা নন, তিনি এমন একজন অভিনেত্রী যিনি পর্দায় নারীর নানা রূপকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিনীত বহু চরিত্র সেই সময়ের সামাজিক রীতিনীতি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, সম্পর্কের জটিলতা এবং নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তাই কয়েক দশক পেরিয়েও রেখার কিছু সিনেমা দর্শকদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
‘উমরাও জান’-এ অসাধারণ অভিনয়
১৯৮১ সালের ক্লাসিক ছবি ‘উমরাও জান’ রেখার অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। এখানে তিনি এমন এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যাঁর প্রতিভা, সৌন্দর্য এবং সংস্কৃতিবোধ থাকা সত্ত্বেও সমাজের কঠোর বাস্তবতা তাঁর জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে।চরিত্রটির মধ্যে ছিল কবিতা, সঙ্গীত, আবেগ এবং গভীর বেদনা। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য রেখা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। আজও ‘উমরাও জান’ বললেই অনেকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে রেখার সেই অনবদ্য অভিনয়।
‘খুন ভরি মাং’-এ অন্য রূপে রেখা
১৯৮৮ সালের ‘খুন ভরি মাং’ রেখার ক্যারিয়ারে একেবারে অন্য ধরনের চরিত্র নিয়ে আসে। ছবিতে আরতি সাক্সেনার ভূমিকায় তাঁকে দেখা যায়।স্বামীর হাতে প্রতারিত ও মৃত বলে পরিত্যক্ত হওয়ার পর তাঁর চরিত্রটি নিজের জীবন ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নামে। পরবর্তীতে প্রতিশোধের পথে এগিয়ে যায় সেই নারী। শক্তিশালী ও দৃঢ়চেতা চরিত্র হিসেবে ছবিতে রেখার উপস্থিতি দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
‘খুবসুরত’-এর স্বাধীনচেতা মঞ্জু
১৯৮০ সালের ‘খুবসুরত’ ছবিতে রেখার চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের। মঞ্জু দয়াল নামের প্রাণবন্ত ও স্বাধীনচেতা তরুণী একটি রক্ষণশীল পরিবারের কঠোর নিয়মকানুনের সামনে নিজের স্বতন্ত্র সত্তা বজায় রাখে।হাসি, মজা ও প্রাণচাঞ্চল্যের মধ্য দিয়ে ছবিটি আসলে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং পুরনো সামাজিক রীতিনীতির সংঘাতের গল্প বলে। মঞ্জু চরিত্রে রেখার অভিনয় ছবিটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।
‘আস্থা’-য় সম্পর্কের জটিল বাস্তবতা
১৯৯৭ সালের ‘আস্থা: ইন দ্য প্রিজন অফ স্প্রিং’ ছবিতে রেখাকে দেখা যায় মানসী চরিত্রে। এই ছবির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক মধ্যবিত্ত নারীর ব্যক্তিগত জীবন, একাকীত্ব, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা এবং দাম্পত্যের বাইরের এক জটিল সম্পর্ক।চরিত্রটির মাধ্যমে একজন নারীর মানসিক টানাপোড়েন ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। রেখার অভিনয় সেই জটিল আবেগকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলে।
‘সুপার নানি’-তে বয়স নয়, আত্মবিশ্বাসই আসল
রেখার অভিনীত ‘সুপার নানি’ ছবিটিও নারীর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের কথা বলে। ইন্দ্র কুমারের পরিচালিত এই কমেডি-ড্রামায় রেখার সঙ্গে ছিলেন শারমান জোশী, রণধীর কাপুর, অনুপম খের এবং রাজেশ কুমার।গুজরাটি নাটক ‘বা এ মারি বাউন্ডারি’ অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে পরিবারের মধ্যে একজন নারীর ভূমিকা এবং তাঁর নিজের পরিচয়ের গুরুত্বকে সামনে আনা হয়।
‘ইজাজত’-এ সম্পর্কের অন্য সমীকরণ
১৯৮৭ সালের ‘ইজাজত’ রেখার অভিনয়জীবনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। গুলজার পরিচালিত এই সিনেমাটি সুবোধ ঘোষের বাংলা গল্প ‘জতুগৃহ’ অবলম্বনে নির্মিত।ছবিতে রেখার সঙ্গে অভিনয় করেন নাসিরুদ্দিন শাহ ও অনুরাধা প্যাটেল। সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা এবং অতীতের টানাপোড়েন—সবকিছু মিলিয়ে ছবিটি ছিল আবেগঘন। রেখার সংযত অভিনয় চরিত্রটিকে আরও গভীরতা দিয়েছিল।
কেন আজও আলোচনায় রেখার এই ছবিগুলি?
রেখার অভিনীত এই ছবিগুলির বিশেষত্ব শুধু তাঁর তারকাখ্যাতি নয়। বরং নারী চরিত্রগুলিকে একমাত্রিকভাবে দেখানোর পরিবর্তে তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছা, দুর্বলতা, সিদ্ধান্ত, প্রতিবাদ এবং আবেগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।কখনও তিনি সমাজের তৈরি নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, কখনও নিজের অস্তিত্ব খুঁজেছেন, আবার কখনও সম্পর্কের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। এই কারণেই তাঁর বহু চরিত্র সময় পেরিয়েও দর্শকদের কাছে প্রাসঙ্গিক।
বলিউডের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেত্রী রেখা তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে একাধিক শক্তিশালী নারীকেন্দ্রিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কখনও তিনি সমাজের কঠিন নিয়মে আটকে থাকা নারী, কখনও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা স্বাধীনচেতা চরিত্র, আবার কখনও নিজের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করা এক সাধারণ মহিলা। ‘উমরাও জান’, ‘খুন ভরি মাং’, ‘খুবসুরত’, ‘আস্থা’ ও ‘ইজাজত’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও আলোচিত।









