স্বপ্ন ছিল দেশের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হতে সময় লেগে গেল প্রায় ১৮ বছর। একের পর এক চোট, জাতীয় দলের শিবিরে সুযোগ পেয়েও মূল দলে জায়গা না পাওয়া—সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত এল। ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ভারতীয় মহিলা কবাডি দলের হয়ে সোনা জিতে নিজের স্বপ্নপূরণ করলেন রানাঘাটের মেয়ে পিঙ্কি রায়।
স্কুলের মাঠ থেকেই শুরু কবাডির পথচলা
পিঙ্কির কবাডি জীবনের শুরু স্কুলের মাঠে। স্কুলের স্পোর্টস শিক্ষকের উৎসাহেই খেলাটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। এরপর বাংলার হয়ে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে খেলতে শুরু করেন।পরবর্তীতে রেলের দলে যোগ দেন পিঙ্কি। কিন্তু দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলার স্বপ্ন তখনও অধরা। সেই অপেক্ষার অবসান হতে সময় লাগে দীর্ঘ ১৮ বছর।
৩৩ বছর বয়সে এল সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ
২০২৬ এশিয়ান গেমসেই প্রথমবার দেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামার সুযোগ পান পিঙ্কি। বয়স তখন ৩৩ বছর।ফাইনালে ভারতীয় মহিলা কবাডি দল ইরানকে ৩৭-৩৪ পয়েন্টে হারিয়ে সোনা জেতে। আর সেই সোনার পদকই পিঙ্কির দীর্ঘ লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে ওঠে।
ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছিলেন
পিঙ্কির জীবনের লড়াই শুধু খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছোট বয়সেই বাবাকে হারান তিনি। এরপর মা চণ্ডী রায় থিয়েটারে কাজ করে সংসার সামলানোর পাশাপাশি সন্তানদের বড় করে তোলেন।২০১৭ সালে মায়েরও মৃত্যু হয়। এশিয়ান গেমসে সোনা জয়ের পর পিঙ্কি জানিয়েছেন, বাবা-মা বেঁচে থাকলে তাঁর এই সাফল্যে তাঁরা অত্যন্ত খুশি হতেন।মায়ের পরিশ্রম এবং ত্যাগই তাঁর জীবনের ভিত তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন পিঙ্কি।
বারবার চোট, তবুও থামেনি লড়াই
কবাডির কেরিয়ারে চোটও বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সালে হাঁটুর অস্ত্রোপচার করাতে হয় তাঁকে।২০১৯ সালে দক্ষিণ এশীয় গেমসের শিবিরে সুযোগ পেয়েও হাঁটুর চোট ও অস্ত্রোপচারের কারণে সরে যেতে হয়। এরপর ২০২৪ সালে বিশ্বকাপের শিবিরে জায়গা পেলেও চূড়ান্ত দলে জায়গা হয়নি।একাধিকবার জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছে ফিরে আসতে হলেও অনুশীলন ও খেলা ছাড়েননি পিঙ্কি। অবশেষে ২০২৬ সালে সেই অপেক্ষার অবসান।
এবার বাংলায় ফিরে কাজ করার স্বপ্ন
২০১৬ সাল থেকে সাউথ সেন্ট্রাল রেলের সঙ্গে যুক্ত পিঙ্কি। বর্তমানে তাঁর কর্মস্থল হায়দরাবাদে। তবে নিজের রাজ্য বাংলায় ফিরে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।সুযোগ পেলে কলকাতায় ফিরে আসতে চান তিনি। শুধু নিজের খেলা চালিয়ে যাওয়া নয়, বাংলার তরুণ প্রতিভাদের জন্য একটি কবাডি অ্যাকাডেমি তৈরি করার স্বপ্নও রয়েছে পিঙ্কির।
সামনে বিশ্বকাপ, আরও কয়েক বছর খেলতে চান
এশিয়ান গেমসে সোনা জয়ের পর থেমে যেতে চান না রানাঘাটের এই কবাডি খেলোয়াড়। আগামী বছরের বিশ্বকাপকেও লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন তিনি।পিঙ্কির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরও প্রায় দু’বছর খেলা চালিয়ে যেতে চান। দীর্ঘ ১৮ বছরের লড়াইয়ের পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পেলেও তাঁর সামনে এখনও রয়েছে নতুন লক্ষ্য।
রানাঘাটের রথতলা বাজারের গলি থেকে জাপানের নাগোয়া—দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষা, চোট এবং জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার হতাশা পেরিয়ে ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ভারতীয় মহিলা কবাডি দলের হয়ে সোনা জিতেছেন পিঙ্কি রায়। তাঁর এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে মায়ের সংগ্রাম এবং দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম।










