উত্তরাখণ্ডের শিক্ষা ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত ক্ষেত্রে বুধবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি হরিদ্বারে পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ গুরুকুলের উদ্বোধন করেছেন। হরিদ্বারে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানকে আয়ুর্বেদ, ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং আধুনিক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়ের একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী অংশ নেন এবং গুরুকুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
পতঞ্জলির পরিচালিত গুরুকুলীয় শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়। এর আওতায় বৈদিক ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার সঙ্গে আধুনিক বিষয়ের শিক্ষাকেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পতঞ্জলি গুরুকুলমের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখানে সংস্কৃত ও বৈদিক গ্রন্থের পাশাপাশি ইংরেজি, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য আধুনিক বিষয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাগত ধারণায় শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হরিদ্বারে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের গুরুত্ব এই কারণেও রয়েছে যে উত্তরাখণ্ড দীর্ঘদিন ধরে যোগ, আয়ুর্বেদ এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হরিদ্বারে ইতিমধ্যেই পতঞ্জলির সঙ্গে যুক্ত একাধিক শিক্ষামূলক ও আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আয়ুর্বেদ-কেন্দ্রিক গুরুকুলের উদ্যোগ ওই শিক্ষাগত পরিসরকে আরও সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী ধামি বুধবার আয়ুর্বেদ দিবস উপলক্ষে ভগবান ধন্বন্তরির পূজা-অর্চনাও করেন। এরপর তিনি হরিদ্বারে পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ গুরুকুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
পতঞ্জলি গুরুকুলমের সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রাচীন বৈদিক গুরুকুল পরম্পরা এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ভিশনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক উপলব্ধি, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার বিষয়টি রয়েছে। এই ধারণার অধীনে সংস্কৃত, বৈদিক শিক্ষা ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার পাশাপাশি বিজ্ঞান এবং ইংরেজির মতো বিষয়কেও শিক্ষাব্যবস্থায় স্থান দেওয়া হয়েছে।
গুরুকুলের পটভূমি বেশ পুরনো। পতঞ্জলির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পতঞ্জলি গুরুকুলমের প্রথম উদ্বোধন হয়েছিল জুন ২০১৭ সালে। এরপর হরিদ্বার এবং দেবপ্রয়াগে পৃথক ক্যাম্পাসের মাধ্যমে এর শিক্ষামূলক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় হরিদ্বারে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। দেবপ্রয়াগেও ছাত্রীদের জন্য গুরুকুল পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভারতীয় শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে অনুমোদিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পতঞ্জলি গুরুকুলমের সরকারি বিবরণে বলা হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য শুধুমাত্র পরীক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা নয়; বরং তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সংস্কার, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলাও এর উদ্দেশ্য। গুরুকুল মডেলে দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার চেষ্টা করা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক পরিস্থিতিও বুঝতে পারে।
আয়ুর্বেদ গুরুকুলের উদ্যোগের একটি প্রধান দিক ভারতীয় চিকিৎসা পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা এগিয়ে নেওয়া। আয়ুর্বেদ ভারতের প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলির অন্যতম এবং এর জ্ঞানকে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য দেশজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হরিদ্বারের মতো শহরে এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আয়ুর্বেদ-সংক্রান্ত বিষয়ের অধ্যয়ন, প্রশিক্ষণ এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার বোঝাপড়াকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি আয়ুর্বেদ দিবস উপলক্ষে আয়ুর্বেদকে ভারতের প্রাচীন জ্ঞানপরম্পরা এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন। তিনি ভগবান ধন্বন্তরির পূজা করে রাজ্যের মানুষের স্বাস্থ্য, সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন। একই দিনে পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ গুরুকুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি শিক্ষা ও আয়ুর্বেদের সঙ্গে যুক্ত এই অনুষ্ঠানকে আরও গুরুত্ব দেয়।
গুরুকুলীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তুত করাও। পতঞ্জলি গুরুকুলমের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সংস্কৃত ও বৈদিক গ্রন্থের পাশাপাশি ইংরেজি, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিষয়কেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে শিক্ষার্থীদের বিস্তৃত শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পতঞ্জলি গুরুকুলমের সরকারি প্রস্পেক্টাসে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখায় প্রি-নার্সারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা দেওয়া হয়। হরিদ্বারে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক ক্যাম্পাস এবং দেবপ্রয়াগে ছাত্রীদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ব্যাকরণ ও দর্শনের মতো বিষয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার ও আবাসনসহ বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহযোগিতা রাশির বিনিময়ে শিক্ষার ব্যবস্থা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই শিক্ষামডেলে আয়ুর্বেদের পাশাপাশি যোগ এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরাকেও গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। হরিদ্বার ইতিমধ্যেই যোগ ও আয়ুর্বেদ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের একটি প্রধান কেন্দ্র। রাজ্য সরকারও ঋষিকুল এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে আয়ুর্বেদ, যোগ ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার বিশেষায়িত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ মুখ্যমন্ত্রী ঋষিকুলকে আয়ুর্বেদ, যোগ এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার একটি বিশেষায়িত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন।
উত্তরাখণ্ডে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটেও এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। রাজ্যে যোগ, আয়ুর্বেদ, সংস্কৃত এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গুরুকুলীয় শিক্ষাকে আধুনিক পাঠ্যক্রম ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পৃথক শিক্ষাগত বিকল্প তৈরি করতে পারে।
পতঞ্জলির শিক্ষাব্যবস্থায় বৈদিক অধ্যয়নের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করার মডেল আগেই বিকশিত করা হচ্ছে। সরকারি বিবরণে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের সংস্কৃত ও বৈদিক শাস্ত্রের পাশাপাশি ইংরেজি এবং বিজ্ঞানও পড়ানো হয়। প্রতিষ্ঠানের দাবি অনুযায়ী, এই মিশ্র শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য এমন শিক্ষার্থী তৈরি করা, যারা ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ বোঝার পাশাপাশি আধুনিক সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করতে পারে।
হরিদ্বারে বুধবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর আয়ুর্বেদ এবং গুরুকুলীয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত ক্ষেত্রে নতুন কার্যক্রমের সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আয়ুর্বেদ, যোগ, সংস্কৃত এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলিতে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দিকে কাজ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আধুনিক বিষয়ের পড়াশোনা চালু থাকায় শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী এবং সমকালীন উভয় ক্ষেত্রের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেতে পারে।
উত্তরাখণ্ডে শিক্ষাকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা নতুন নয়। তবে আয়ুর্বেদকে কেন্দ্র করে গুরুকুলীয় মডেলকে এগিয়ে নেওয়া এই দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী ধামির উপস্থিতিতে পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ গুরুকুলের উদ্বোধন এই বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়ুর্বেদ, যোগ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি ফের সামনে এসেছে।
হরিদ্বারে পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ গুরুকুলের উদ্বোধন উত্তরাখণ্ডে শিক্ষা ও ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার ক্ষেত্রে একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। গুরুকুলীয় পদ্ধতিতে বৈদিক ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার মডেল শিক্ষার্থীদের বিস্তৃত শিক্ষাগত পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করছে। পতঞ্জলির বর্তমান গুরুকুল ব্যবস্থায় সংস্কৃত, বৈদিক শিক্ষা, ইংরেজি এবং বিজ্ঞানের মতো বিষয়ের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এই মডেল ইতিমধ্যেই বিকশিত হচ্ছে। এবার আয়ুর্বেদ-কেন্দ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে সেটিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।










