কখনও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়া সোনার বাজারে এবার দেখা দিয়েছে দরপতন। সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বুলিয়ন বাজারে চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও হলুদ ধাতুর দামে তার প্রভাব পড়েছে। শুধু সোনা নয়, রুপোর দাম এবং মূল্যবান ধাতুর ETF-গুলিতেও পতন দেখা গিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন এই পরিবর্তন? এর পিছনে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ।

আন্তর্জাতিক বাজারে পতনের প্রভাব দেশের বাজারে
সোনার দাম শুধু দেশের চাহিদা-জোগানের উপর নির্ভর করে না। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ওঠানামার প্রভাব ভারতীয় বাজারেও পড়ে। সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বুলিয়ন মার্কেটে চাপ তৈরি হওয়ায় দেশের বাজারেও সোনা ও রুপোর দর কমেছে।২৮ সেপ্টেম্বর সোনা ও রুপোর এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডেও পতন দেখা যায়। রুপোর ETF-এর দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোনার ETF-ও ২ শতাংশের বেশি নেমেছিল।
শক্তিশালী ডলার কেন সোনার উপর চাপ তৈরি করে?
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম সাধারণত মার্কিন ডলারে নির্ধারিত হয়। ফলে ডলারের শক্তি বাড়লে অন্যান্য মুদ্রায় সোনা তুলনামূলকভাবে বেশি দামি হয়ে উঠতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদার উপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।বর্তমান পরিস্থিতিতে শক্তিশালী মার্কিন মুদ্রাও তাই সোনার দামের উপর অন্যতম প্রভাবশালী কারণ হিসেবে কাজ করছে।
মার্কিন বন্ডের ইল্ডও গুরুত্বপূর্ণ
মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে সুদ-নির্ভর সম্পদের আকর্ষণ বাড়তে পারে। ফলে কোনও সুদ না দেওয়া সোনার তুলনায় বন্ডের মতো সম্পদে অর্থ যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।এই কারণেই মার্কিন বন্ডের ইল্ডের ওঠানামা আন্তর্জাতিক সোনার বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সুদের হার দীর্ঘদিন বেশি থাকলে কী হয়?
অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহণসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ বাড়তে পারে। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি সুদের হার দ্রুত কমাবে না, বরং দীর্ঘ সময় তুলনামূলক উচ্চস্তরে রাখতে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। উচ্চ সুদের হারের এই সম্ভাবনা সোনার দামের উপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তেলের দামও সোনার বাজারকে প্রভাবিত করছে
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এই পরিস্থিতিতে ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তেলের দাম বাড়লে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়ে, আর সেখান থেকেই সুদের হার নিয়ে বাজারের প্রত্যাশায় পরিবর্তন আসতে পারে। সেই প্রভাব পরোক্ষভাবে সোনার বাজারেও পড়ে।

আগামী দিনে সোনার দাম আরও কমবে?
এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে সোনার দাম আরও কমবে, নাকি আবার বাড়তে শুরু করবে। কারণ সোনার দামের গতিপথ একসঙ্গে একাধিক আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে।মার্কিন ডলারের গতিবিধি, ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড, সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা, অপরিশোধিত তেলের দাম, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের কেনাবেচা—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই আগামী দিনে সোনার বাজারের দিক নির্ধারিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে চাপের প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। শক্তিশালী মার্কিন ডলার, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের উচ্চ ইল্ড, সুদের হার দীর্ঘদিন বেশি থাকার সম্ভাবনা এবং অপরিশোধিত তেলের দাম—একাধিক কারণ একসঙ্গে সোনার দামের উপর প্রভাব ফেলছে।












