তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেভন্ত রেড্ডি গোয়ায় কংগ্রেসের একটি সভায় ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাবণ এবং কংগ্রেসকে ভগবান রামের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ২০২৭ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে পরাজিত করতে ভোটারদের কংগ্রেসকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি ছোট রাজনৈতিক দলগুলিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
গোয়ায় কংগ্রেসের সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে রেভন্ত রেড্ডি অভিযোগ করেন, বিজেপি মানুষকে বিভক্ত করার রাজনীতি করে, অন্যদিকে কংগ্রেস ঐক্যের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর বক্তব্য, বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইলে ভোটারদের কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক ‘হাত’-এ ভোট দিতে হবে। ছোট দলগুলিকে ভোট দিলে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।
২০২৭ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচনের আগে রেড্ডির এই বক্তব্য সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, গোয়ায় কংগ্রেসের পক্ষে তেলেঙ্গানায় ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যে উৎসাহ দেখা গিয়েছিল, তেমনই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী নিয়েও একাধিক অভিযোগ তোলেন।
গোয়ায় কংগ্রেসের সভায় রামায়ণের প্রসঙ্গ তুলে রেভন্ত রেড্ডি বিজেপি ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি সমাজে বিভাজন তৈরি করে, অন্যদিকে কংগ্রেস মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার রাজনীতি করে।
রেড্ডি বলেন, বিজেপিকে পরাজিত করতে হলে ভোটারদের কংগ্রেসের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, বিজেপিবিরোধী ভোট বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গেলে কংগ্রেসের নির্বাচনী ফল প্রভাবিত হতে পারে এবং তাতে বিজেপি সুবিধা পেতে পারে।
গোয়ায় বিরোধী ভোট একজোট রাখা কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে ছোট দলগুলিকে ভোট দেওয়ার ফলে বিজেপি কতটা সুবিধা পাবে, তা নির্বাচনী সমীকরণ, প্রার্থী এবং ভোটারদের মনোভাবের ওপর নির্ভর করবে।
গোয়ায় কংগ্রেসের নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন রেভন্ত রেড্ডি। তিনি বলেন, তেলেঙ্গানায় ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যে উৎসাহ দেখা গিয়েছিল, গোয়াতেও তিনি একই ধরনের পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছেন।
২০২৩ সালের তেলেঙ্গানা বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করে এবং রেভন্ত রেড্ডি মুখ্যমন্ত্রী হন। সেই অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে তিনি ইঙ্গিত দেন, গোয়াতেও কংগ্রেস সরকার গঠনের অবস্থানে পৌঁছতে পারে।
তবে গোয়ার ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ভোটারদের মনোভাব, রাজনৈতিক জোট, স্থানীয় ইস্যু এবং নির্বাচনী প্রচারের ওপর নির্ভর করবে।
রেভন্ত রেড্ডি ভোটারদের ভোট দেওয়ার আগে নিজেদের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, বিজেপিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে চাইলে ভোটারদের কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীকে ভোট দেওয়া উচিত।
দক্ষিণ গোয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই অঞ্চল ঐতিহ্যগতভাবে কংগ্রেসের শক্তিশালী ভিত্তি। তাঁর মতে, কংগ্রেস পর্যাপ্ত সমর্থন না পেলে এবং ছোট দলগুলির প্রভাব বাড়লে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
রাজ্যের ক্ষমতা কার হাতে দেখতে চান, সেই প্রশ্নও ভোটারদের সামনে রাখেন রেড্ডি। ভাষণে তিনি মাদক মাফিয়া এবং নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মাফিয়াদের প্রসঙ্গ তুলে বিজেপিকে আক্রমণ করেন। এই মন্তব্যগুলি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগের অংশ; প্রদত্ত বিবরণে এগুলির সমর্থনে স্বাধীন প্রমাণের উল্লেখ নেই।
রেড্ডির বক্তব্য, বিজেপিবিরোধী ভোটারদের কৌশলগতভাবে নিজেদের ভোট ব্যবহার করা উচিত। তবে ছোট দলগুলির প্রকৃত প্রভাব নির্বাচনে প্রার্থী, অঞ্চল এবং ভোটের বণ্টনের ওপর নির্ভর করবে।
ভাষণে রেভন্ত রেড্ডি রাহুল গান্ধীর ভূমিকারও প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্য, রাহুল গান্ধী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বিজেপির বিরুদ্ধে সমাজকে বিভক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করার অভিযোগ তোলেন রেড্ডি। নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া বিরোধী দলগুলির সমর্থকদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকার এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নাগরিকদের ভোটাধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রেড্ডির দাবি, দেশে যাঁদের ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং যাঁদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন, তাঁদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে।

তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার কথিত অপব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগগুলি যাচাই করতে সরকারি পরিসংখ্যান, নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আপাতত এই বক্তব্যগুলিকে রেড্ডির রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
ধর্মীয় প্রতীক ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই রেভন্ত রেড্ডির সাম্প্রতিক মন্তব্য সামনে এসেছে। এর আগে ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দেওয়া একটি বক্তব্যে তিনি ভগবান রাম ও ভগবান শিবকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।
প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি ভগবান রামকে ধনীদের এবং ভগবান শিবকে দরিদ্রদের সঙ্গে যুক্ত করে বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মীয় প্রতীককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিলেন।
রেড্ডির দাবি ছিল, বিজেপি ভগবান রামকে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ করে তুলেছে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় প্রতীকের ব্যবহার বিভিন্ন সময়ে আলোচনার বিষয় হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গ ব্যবহার করে। এ ধরনের মন্তব্য ঘিরে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গিয়েছে।
২০১৭ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের সময় রাহুল গান্ধীর মন্দির পরিদর্শন এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছিল। সেই সময় বিজেপি নেতারা তাঁর মন্দির পরিদর্শনকে নির্বাচনী কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এর জবাবে রাহুল গান্ধী নিজেকে ভগবান শিবের ভক্ত বলে উল্লেখ করেন।
সোমনাথ মন্দিরের দর্শনার্থী রেজিস্টার ঘিরে বিতর্কের সময়ও তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। রাহুল গান্ধী তখন বলেছিলেন, কথিতভাবে অ-হিন্দু দর্শনার্থীদের জন্য রাখা রেজিস্টারে তিনি স্বাক্ষর করেননি; বরং দর্শনার্থীদের খাতায় স্বাক্ষর করেছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুনে লোকসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় রাহুল গান্ধী ভগবান শিবের ছবির উল্লেখ করে ‘ডরো মত, ডরাও মত’ অর্থাৎ ‘ভয় পেয়ো না, ভয় দেখিয়ো না’ বার্তা দেন। তাঁর ওই ভাষণ নিয়ে বিজেপি নেতারা আপত্তি জানান এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মীয় প্রসঙ্গ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
রেভন্ত রেড্ডির বক্তব্যকে গোয়ায় কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচার জোরদার করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রামায়ণের উদাহরণ, বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং ছোট দলগুলিকে ভোট দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি ভোটারদের কংগ্রেসের পক্ষে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান।
২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সম্ভাবনা স্থানীয় ইস্যুতে ভোটারদের সমর্থন অর্জন এবং বিরোধী দলগুলির মধ্যে নির্বাচনী সমীকরণ কীভাবে গড়ে ওঠে, তার ওপরও নির্ভর করতে পারে।
রেড্ডির বক্তব্যের পর গোয়ার রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতীক, নির্বাচনী কৌশল এবং বিরোধী ভোটের বিভাজন নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। তাঁর অভিযোগের বিষয়ে বিজেপির প্রতিক্রিয়া এবং আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির কৌশল কী হয়, তা পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












