যে সিঙ্গুর একসময় বাংলার শিল্প রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেই মাটিতে দাঁড়িয়েও শিল্প নিয়ে নীরব থাকলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবারের জনসভায় টাটাদের ফেরানো বা নতুন গাড়ি কারখানা গড়ার কোনও ইঙ্গিত না দিয়ে তিনি বরং হুগলির পাটচাষি ও বাংলার মৎস্যজীবীদের সমস্যার কথাই তুলে ধরলেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা ছড়িয়েছে বঙ্গ–বিজেপি ও শিল্পের স্বপ্ন দেখা স্থানীয়দের মধ্যে।
বিজেপির প্রত্যাশা, ভেঙে পড়া আশার বেলুন
সভা শুরুর আগেই বঙ্গ–বিজেপির অন্দরমহলে ধারণা ছিল, সিঙ্গুরের মাটি থেকেই শিল্পায়নের জোরালো বার্তা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে সিঙ্গুরকে ‘শিল্পের বধ্যভূমি’ বলে আখ্যা দিয়ে নতুন বিনিয়োগ ও ভারী শিল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার তো আরও এক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেন—২০২৬ সালে বাংলায় বিজেপি সরকার এলে টাটাকে সিঙ্গুরে ফিরিয়ে আনা হবেই।
মোদীর ভাষণে টাটার নামও নেই
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে ওঠার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ‘টাটার মাঠে’ সভা করেও মোদী একবারের জন্যও টাটার নাম উচ্চারণ করেননি। সিঙ্গুরে গাড়ি কারখানা বা অন্য কোনও ভারী শিল্প গড়ার প্রতিশ্রুতিও দেননি। শুধু বলেন, “বাংলায় আইনের শাসন ফিরলে বিনিয়োগও আসবে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি ক্ষমতায় না এলে শিল্প নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে চাননি তিনি।
পাটশিল্পে জোর, প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে বার্তা
ভারী শিল্পে নীরব থাকলেও হুগলির পাটশিল্প নিয়ে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘এক জেলা–এক পণ্য’ প্রকল্পের আওতায় পাট ও হস্তশিল্পকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে পাটজাত পণ্যের প্রসারে জোর দেন মোদী।
মৎস্যজীবী ইস্যুতে তৃণমূলকে আক্রমণ
মোদীর ভাষণে বিশেষ জায়গা পায় বাংলার মৎস্যজীবীদের সমস্যা। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মৎস্যজীবীদের নথিভুক্তিকরণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইচ্ছাকৃত বাধা দিচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখেও কোনও সাড়া মিলছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
হতাশ বিজেপি, পাল্টা আক্রমণে তৃণমূল
প্রধানমন্ত্রীর নীরবতায় চাপে পড়েছেন বিজেপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য, সিঙ্গুরে শিল্প নিয়ে কিছু না বলায় হতাশা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল এই ‘সিঙ্গুর–নীরবতা’কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। শিল্পমন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, “প্রধানমন্ত্রী কোনও আশার আলো দেখাতে পারেননি।” সিঙ্গুর আন্দোলনের নেতা তথা মন্ত্রী বেচারাম মান্নার দাবি, তৃণমূল জমানায় ইতিমধ্যেই সেখানে প্রায় ১৬০০ ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠেছে।
সিঙ্গুরের সভা ঘিরে বড় শিল্প ও টাটাদের প্রত্যাবর্তনের আশায় বুক বেঁধেছিলেন বঙ্গ–বিজেপির নেতা-কর্মী ও একাংশ কৃষক। কিন্তু রবিবার প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সেই প্রত্যাশা ভেস্তে যায়। গাড়ি কারখানা বা ভারী শিল্পের প্রতিশ্রুতি না দিয়ে মোদী জোর দেন পাটশিল্প ও মৎস্যজীবীদের ‘দুরবস্থা’র উপর।





