হাতে তুলি ধরে ছবি আঁকা শিল্পীদের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু মুখে তুলি চেপে নিখুঁত প্রতিকৃতি আঁকা? বাঁকুড়ার শিল্পী অমিতায়ু দাসের কাছে সেটাই যেন শিল্পের এক বিশেষ ভাষা। এবার তাঁর ক্যানভাসে ফুটে উঠল ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচারের মুখ। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুখে তুলি ধরে প্রতিকৃতি এঁকে তিনি জানালেন শ্রদ্ধা ও সাহসিকতার এক অন্যরকম বার্তা।
মুখে তুলি, তবু নিখুঁত প্রতিকৃতি
অমিতায়ু দাসের হাতে এবার তুলি ছিল না। মুখে তুলি চেপেই ক্যানভাসে একের পর এক আঁচড় টেনে তৈরি করলেন স্মিত মাচারের প্রতিকৃতি। অল্প সময়ের মধ্যেই পাইলটের মুখের আদল ফুটিয়ে তোলেন তিনি।এই অভিনব পদ্ধতিতে ছবি আঁকার দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে স্থানীয় মানুষের। কারণ হাতে তুলি নিয়ে একটি প্রতিকৃতি তৈরি করতেও যথেষ্ট অনুশীলন প্রয়োজন, সেখানে মুখ দিয়ে তুলি নিয়ন্ত্রণ করে এত দ্রুত ছবি আঁকা নিঃসন্দেহে বিরল দক্ষতার পরিচয়।
এই প্রথম নয়, আগেও মুখে এঁকেছেন ছবি
মুখে তুলি ধরে ছবি আঁকা অমিতায়ু দাসের কাছে নতুন কোনও বিষয় নয়। এর আগেও তিনি মুখে তুলি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি এঁকেছেন। এমনকী নিজের মায়ের প্রতিকৃতিও অল্প সময়ের মধ্যে এঁকে ফেলেছেন।শুধু মুখ নয়, দুই হাতের পাশাপাশি পা ব্যবহার করেও ছবি আঁকার দক্ষতা রয়েছে তাঁর। প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে নিয়মিত শিল্পচর্চা করছেন অমিতায়ু।
বাবার কাছেই শিল্পের হাতেখড়ি
ছোটবেলাতেই বাবার কাছ থেকে ছবি আঁকার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় অমিতায়ুর। পরবর্তীতে বর্ধমান আর্ট কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন তিনি।বর্তমানে বাঁকুড়ার একটি বেসরকারি শিশুদের স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি বাবার পরিচালিত আঁকার স্কুলের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। অর্থাৎ শিল্প তাঁর কাছে শুধুমাত্র পেশা নয়, জীবনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী।
কেন স্মিত মাচারের ছবি আঁকলেন?
স্মিত মাচারের প্রতিকৃতি আঁকার পিছনে শুধুমাত্র নিজের অভিনব শিল্পকৌশল দেখানোর উদ্দেশ্য নেই অমিতায়ুর। একজন ভারতীয় পাইলট হিসেবে বিপদের মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে যাত্রীদের জীবন রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার সাহসিকতাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।সেই শ্রদ্ধা থেকেই ক্যানভাসে স্মিত মাচারের মুখ ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। তাঁর কাছে এই কাজের মূল্য অর্থের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের ভালোবাসা এবং তাঁর শিল্পকে মানুষ গ্রহণ করছেন—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মানুষের গল্পই তাঁর শিল্পের মূল বিষয়
অমিতায়ুর শিল্পচর্চায় বারবার উঠে আসে সাধারণ মানুষের জীবন ও তাঁদের গল্প। হারিয়ে যেতে বসা পেশা এবং সেই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবন নিয়েও কাজ করতে আগ্রহী তিনি।বর্তমানে রিকশাচালকদের জীবন নিয়ে একটি বিশেষ প্রকল্পে কাজ করছেন এই শিল্পী। আধুনিকতার চাপে ধীরে ধীরে কমে আসা রিকশা পরিষেবা এবং তার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবনযাত্রাকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তিনি।
শিল্প শুধু ছবি নয়, বার্তা পৌঁছনোর মাধ্যম
স্মিত মাচারের প্রতিকৃতি আঁকার মাধ্যমে অমিতায়ু যেন আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন, শিল্পের পরিধি কেবল ক্যানভাসে রং-তুলি চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষের সাহস, আত্মত্যাগ, অনুভূতি কিংবা জীবনের গল্পও শিল্পের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।মুখে তুলি ধরে কয়েক মিনিটে তৈরি করা স্মিত মাচারের প্রতিকৃতি তাই নিছক একটি ছবি নয়। এর মধ্যে রয়েছে শ্রদ্ধা, অনুপ্রেরণা এবং মানুষের জন্য কিছু করার সাহসের বার্তা।
বাঁকুড়ার শিল্পী অমিতায়ু দাস মুখে তুলি চেপে মাত্র কয়েক মিনিটে ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচারের প্রতিকৃতি এঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তাঁর সাহসিকতার প্রতি। দুই হাতের পাশাপাশি মুখ ও পা দিয়েও ছবি আঁকার দক্ষতা রয়েছে এই শিল্পীর। তাঁর কাছে এই শিল্প শুধু প্রতিভা প্রদর্শনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের গল্প, সাহস ও আত্মত্যাগকে তুলে ধরার একটি শক্তিশালী ভাষা।










