সক্রিয়কর্মী ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক ভারতের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি একইভাবে চলতে থাকলে ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। ভারতের মাথাপিছু আয় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতির উল্লেখ করে তিনি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক বলেন, গত কয়েক দিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। এই সময়ে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর মতে, ভারতকে এগিয়ে নিতে শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়া এবং শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
ওয়াংচুক বলেন, প্রায় পাঁচ দশক আগে ভারত থেকে পিছিয়ে বা ভারতের কাছাকাছি বলে বিবেচিত অনেক দেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে এগিয়ে গেছে। তিনি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের উদাহরণ দেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত ও সম্মানিত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বর্তমান ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে দেশের অগ্রগতিকে যুক্ত করার কথা বলেন।
তবে মাথাপিছু আয় ও উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে দেশগুলোর তুলনা করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অর্থনৈতিক মানদণ্ড বিবেচনা করা প্রয়োজন। ওয়াংচুক তাঁর বক্তব্যে মূলত ভারতের উন্নয়নের গতি ও মাথাপিছু আয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ওয়াংচুক বলেন, ভারতের শাসনব্যবস্থার সমস্যার জন্য কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু বিরোধী কণ্ঠ দমন এবং ব্যবস্থা-সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্ন ধারাবাহিকভাবে থেকে গেছে।
তিনি রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই দুর্নীতি, অবিচার ও প্রশাসনিক সমস্যার অবসান হয় না। তাঁর মতে, এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং শাসনে জবাবদিহি শক্তিশালী হবে।
সোনম ওয়াংচুক ২০১২-১৩ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনেরও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই সময়ের গণআন্দোলনের পর দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায় এবং সরকার পরিবর্তন হয়। তবে তাঁর মতে, দুর্নীতি ও অবিচারের মতো সমস্যার অবসান হয়নি।
তিনি দাবি করেন, সময়ের সঙ্গে এসব সমস্যা নতুন রূপ নিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও গুরুতর হয়েছে। ওয়াংচুকের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনকে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে না দেখে ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
ওয়াংচুক তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেওয়া বার্তায় শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের কথা বলেন। তাঁর মতে, দেশের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা নিঃস্বার্থ, নির্ভীক, চরিত্রবান এবং সক্ষম।
তিনি নাগরিকদের নিজেদের এলাকা ও দেশে এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানান, যারা সততা ও সক্ষমতার সঙ্গে জনজীবনে অবদান রাখতে পারেন। ওয়াংচুক মানুষকে অন্তত একজন এমন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে বলেন, যাকে তাঁরা দেশের ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব হিসেবে মনে করেন।
তাঁর মতে, এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তাঁদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হবে। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যতের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সহায়তা করতে পারেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি দেখা করতে চান।
ওয়াংচুক তাঁর বার্তায় শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। শিক্ষা মন্ত্রকে পরিবর্তনের পর নতুন ব্যবস্থা থেকে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতের অগ্রগতি সরাসরি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে ভারতের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করা কঠিন। তাঁর মতে, শিক্ষা শুধু কর্মসংস্থানের মাধ্যম নয়; এটি বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা, নাগরিক চেতনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি।
ওয়াংচুক দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা এবং হিমালয় অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত বিষয় নিয়ে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও শিক্ষা ও মানবসম্পদকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এর আগে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সোনম ওয়াংচুক দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছিলেন। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জুন তিনি NEET-UG প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সমর্থনে এই আন্দোলন শুরু করেন।

অনশনের সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৮ জুলাই দিল্লি পুলিশ তাঁকে যন্তর মন্তর থেকে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে তাঁকে মেদান্তা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সরকারের আশ্বাস পাওয়ার পর ২৪ জুলাই তিনি অনশন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন।
আন্দোলনের সময় তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছিল। ৮ জুলাই পর্যন্ত তাঁর ওজন প্রায় ৭ কিলোগ্রাম কমে যাওয়ার এবং রক্তচাপ ১০৩/৬৮ থাকার তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
লাদাখের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দাবিগুলো নিয়েও ওয়াংচুক দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তাঁর আন্দোলনের প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব-সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে।
উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তিনি এর আগে দীর্ঘ সময় হেফাজতে ছিলেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ লেহতে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। ওই ঘটনায় চারজনের মৃত্যু এবং প্রায় ৯০ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
সরকারের পক্ষ থেকে ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা NSA-এর অধীনে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং পরে যোধপুর জেলে পাঠানো হয়। তবে ওয়াংচুক তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং ঘটনায় তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।
ভারত সরকার ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ওয়াংচুকের সাম্প্রতিক বক্তব্য ভারতের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশ, শিক্ষা, শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে। তাঁর মূল বক্তব্য হলো, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে শুধু উন্নত ভারতের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। এর জন্য উন্নত শিক্ষা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক শাসন, দক্ষ নেতৃত্ব এবং নাগরিক অংশগ্রহণও প্রয়োজন।
ওয়াংচুক তাঁর ভিডিও বার্তায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য মানুষকে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, দেশের ভবিষ্যতের জন্য এমন নেতৃত্বকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবেন।
তাঁর এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ভারতে ২০৪৭ সালের উন্নয়ন লক্ষ্য নিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং শাসন সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ওয়াংচুকের বার্তা এই বিতর্কে একটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছে এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।











