Traditional Durga Puja: রাজা নেই, রাজবাড়ির জৌলুসও নেই, তবু অটুট ৩৭৫ বছরের পরম্পরা! দুর্গাপুজোর ১২ দিন আগেই দেবীর আরাধনায় মাতল পাহাড়পুর

দুর্গাপুজোর ১২ দিন আগেই মালদার পাহাড়পুরে শুরু হল ৩৭৫ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজো। রাজা-রাজপাট না থাকলেও কৃষ্ণনবমী থেকে দশমী পর্যন্ত অটুট রয়েছে পুরনো রীতিনীতি।

দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে এখনও বেশ কয়েকদিন বাকি। কিন্তু মালদার চাঁচলে যেন তার আগেই উৎসবের আবহ। চাঁচল শহর থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে পাহাড়পুরের চণ্ডীমণ্ডপে কৃষ্ণনবমীর তিথিতে শুরু হয়ে গেল বহু প্রাচীন দুর্গাপুজো। রাজা-রাজপাট নেই, নেই আগের মতো রাজকীয় আড়ম্বর। তবুও কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা রীতি আজও একইভাবে পালন করে চলেছেন স্থানীয় মানুষ।

দুর্গাপুজোর আগেই শুরু দেবীর আরাধনা

প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, দুর্গাপুজোর নির্ধারিত সময়ের আগেই এখানে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কৃষ্ণনবমীর সকালে মরা মহানন্দার সতীঘাট থেকে তামার কলসে জল নিয়ে আসা হয়। সেই জল দিয়ে ঘট প্রতিষ্ঠার পর শুরু হয় দেবীর প্রাথমিক আরাধনা।প্রতিমা আসার আগের দিনগুলি ঘটেই পুজোর আচার চলবে। ফলে মূল দুর্গাপুজো শুরু হওয়ার অনেক আগেই পাহাড়পুরে তৈরি হয়ে যায় উৎসবের পরিবেশ।

ষষ্ঠীর ভোরে রাজবাড়ি থেকে আসবে প্রতিমা

এই পুজোর অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ প্রতিমা নিয়ে আসার প্রথা। ষষ্ঠীর ভোরে চাঁচল রাজবাড়ি থেকে শোভাযাত্রা করে দেবীর প্রতিমা নিয়ে আসা হবে পাহাড়পুর চণ্ডীমণ্ডপে। এরপর সেখানেই নিয়ম মেনে শুরু হবে মূল পুজোর আনুষ্ঠানিকতাঅর্থাৎ রাজপরিবারের পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পাহাড়পুরের চণ্ডীমণ্ডপের বর্তমান পুজোর যোগ এখনও অটুট রয়েছে।

চতুর্ভুজা সিংহবাহিনী রূপে পূজিতা দেবী

পাহাড়পুর চণ্ডীমণ্ডপের দেবী দুর্গার রূপও বেশ আলাদা। এখানে দেবীকে চতুর্ভুজা সিংহবাহিনী রূপে আরাধনা করা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় চণ্ডীপাঠের আয়োজন থাকে। পুজোর প্রতিটি দিনেই ভোগের ব্যবস্থাও করা হয়।অষ্টমীর দিন বিশেষভাবে পালিত হয় কুমারী পুজো। পুরনো রীতিনীতি মেনেই একের পর এক আচার সম্পন্ন করা হয়।

রাজা রামচন্দ্র রায় চৌধুরীর আমল থেকে পুজো

পুজো উদ্যোক্তাদের দাবি, চাঁচলের রাজা রামচন্দ্র রায় চৌধুরীর সময়েই এই দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই ধরনের রীতিনীতি মেনে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে।প্রায় ৩৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পুজো চললেও পরম্পরার অনেক কিছুই এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। সেই কারণেই স্থানীয় মানুষের কাছে এই পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজপরিবার নেই, পুজোর দায়িত্ব স্থানীয়দের কাঁধে

সময় বদলেছে। রাজপরিবারের সেই পুরনো ক্ষমতা বা জাঁকজমক আর নেই। কিন্তু তাতে পুজোর ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েনি। বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ড এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতাতেই পুজোর যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন হয়।পাহাড়পুর, গিলাবাড়ি এবং চাঁচলের বিভিন্ন এলাকার মানুষ নিজেদের মতো করে পুজোর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের সহযোগিতাতেই আজও প্রাচীন এই পুজো যথেষ্ট উৎসাহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হচ্ছে।

দশমীতে মরা মহানন্দায় বিসর্জন

পুজোর শেষ দিন দশমীতে মরা মহানন্দায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দেবীর আরাধনা। তবে বিসর্জনের পরেও এই পুজোর স্মৃতি ও ঐতিহ্য স্থানীয় মানুষের মধ্যে থেকে যায়।রাজকীয় আড়ম্বর সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেলেও মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসাই যে কোনও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে—পাহাড়পুর চণ্ডীমণ্ডপের ৩৭৫ বছরের পুরনো দুর্গাপুজো তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

মালদার চাঁচল রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পাহাড়পুর চণ্ডীমণ্ডপের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো এবারও শুরু হল দুর্গাপুজোর প্রায় দু’সপ্তাহ আগে। কৃষ্ণনবমীর তিথিতে ঘট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয়েছে পুজোর আচার। রাজপরিবারের পুরনো জৌলুস হারিয়ে গেলেও স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও সহযোগিতায় ৩৭৫ বছরেরও বেশি পুরনো এই পুজোর পরম্পরা এখনও অক্ষুণ্ণ।

Leave a comment