পশ্চিম এশিয়ায় চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শিগগিরই শেষ হতে পারে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এগোচ্ছে এবং তাঁর আশা, এই বিরোধ দীর্ঘ সময় ধরে চলবে না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ ও অস্ত্রের কোনো ঘাটতি নেই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন অস্ত্রের উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পাশাপাশি অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এর প্রভাব জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারেও দেখা যাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান নিজেই আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। তাঁর মতে, যেকোনো সামরিক সংঘাতের তুলনায় কূটনৈতিক সমাধান সব পক্ষের স্বার্থে। তিনি বলেন, সমঝোতা হলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
ট্রাম্প পুনরায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব নিরাপত্তা এবং মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে আলোচনা সফল হলে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা এগোচ্ছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রস্তুত করা খসড়া চুক্তিকে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান বলে জানানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এই পথের যেকোনো ধরনের বিঘ্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে।
ইয়েমেনের সরকারি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হুথি বিদ্রোহীরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ৩০ জন সেনা নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছে।
হুথি গোষ্ঠী এডেন উপসাগরে একটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলারও দাবি করেছে। এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইয়েমেনের সংঘাতকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। হুথি বিদ্রোহীরা পূর্ব ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো সৌদি-সমর্থিত সরকারের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের তথ্য অনুযায়ী, নজরান বিমানবন্দরে হামলায় ১১ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত একইভাবে চলতে থাকলে ইয়েমেন আবারও ব্যাপক গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারে।
সামুদ্রিক নজরদারি সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, বর্তমানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বাব-আল-মান্দেব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। উভয় সামুদ্রিক পথই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের পার্লামেন্টে এমন একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং অন্যান্য বিরোধী দেশের জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজের পণ্যমূল্যের ২০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা আরোপের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বের আটটি প্রধান শিপিং সংস্থা জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার কাছে আহ্বান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কোনো অতিরিক্ত ফি বা টোল আরোপ না করতে। তাদের মতে, এতে বৈশ্বিক শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব পড়বে।
দক্ষিণ লেবাননের একটি ভবনে বিস্ফোরণে দুইজন ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একাধিক এলাকায় পাল্টা বিমান হামলা চালায়। এর ফলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে। দুই নেতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বর্তমান উত্তেজনা এবং ভারত-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্ব-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার প্রভাব আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারেও পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলার অতিক্রম করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে সংকট আরও গভীর হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক পরিবহন এবং মূল্যস্ফীতির ওপর পড়তে পারে। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা সফল হলে বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে হুথি হামলা, সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতার কারণে পরিস্থিতি এখনও সংবেদনশীল রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সামরিক পরিস্থিতির ওপর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর থাকবে।








