মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প ওশান’ অথবা ‘ওশান অফ দ্য আমেরিকা’ রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, টেনেসির ক্লার্কসভিলে একটি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০২৮ সালে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি একটি মহাসাগর ও একটি বড় নদীর নাম পরিবর্তন করতে চান। তাঁর এই মন্তব্যে জনসভায় উপস্থিত ব্যক্তিরা হাসি ও করতালির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। তবে মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের জন্য ট্রাম্প এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করেননি।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও একাধিক ভৌগোলিক স্থানের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। মেক্সিকো উপসাগরের নাম ‘গালফ অফ আমেরিকা’ করার সিদ্ধান্ত এবং অন্টারিও হ্রদের নাম ‘লেক আমেরিকা’ রাখার নির্দেশকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে নামকরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
টেনেসির জনসভায় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি উপসাগর ও একটি হ্রদ রয়েছে, তবে এবার একটি মহাসাগরের নামও পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের জন্য তিনি ‘ট্রাম্প ওশান’ এবং ‘ওশান অফ দ্য আমেরিকা’ নামের প্রস্তাব দেন।
২০২৮ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে একটি বড় নদীর নাম পরিবর্তনের ইচ্ছার কথাও জানান ট্রাম্প। তবে কোন মহাসাগর বা নদীর নাম পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
বর্তমানে এই মন্তব্যকে একটি প্রস্তাব বা ধারণা হিসেবেই দেখা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিক সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়। ফলে আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এমন দাবি করার মতো তথ্য এখনও নেই।
ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অফ আমেরিকা’ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। মার্কিন সরকার সরকারি নথি ও মানচিত্রে নতুন নামটি প্রয়োগের পদক্ষেপ নেয়।
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নামকরণ এবং ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। মেক্সিকো প্রচলিত নামের ব্যবহার বজায় রাখে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন নিজেদের সরকারি ব্যবহারের জন্য নতুন নাম গ্রহণ করে।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, কোনও দেশ তার সরকারি নথিতে একটি ভৌগোলিক স্থানের নতুন নাম ব্যবহার করতে পারে। তবে তার ফলে অন্য দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই নাম গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায় না।
২০২৬ সালের আগস্টে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে অবস্থিত অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার জন্য একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। মার্কিন সরকারের সরকারি নথি অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট ২০২৬-এর ওই আদেশে ফেডারেল রেকর্ড ও সরকারি তথ্যসূত্রে নতুন নাম ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্টারিও হ্রদ উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকস ব্যবস্থার অংশ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য এবং কানাডার অন্টারিও প্রদেশের মধ্যে অবস্থিত। ফলে হ্রদটির নাম পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু মার্কিন অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি কানাডার সঙ্গে যৌথ ভৌগোলিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত।
এই উদাহরণে দেখা যায়, মার্কিন সরকার নিজের অধিক্ষেত্রে সরকারি নথিতে ভৌগোলিক নামের ব্যবহার নির্ধারণ করতে পারে। তবে কোনও যৌথ জলভাগের নাম আন্তর্জাতিক স্তরে পরিবর্তিত হওয়া পৃথক বিষয়।
এর আগে ট্রাম্প মার্কিন অঙ্গরাজ্য নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তন করে ‘নিউ আমেরিকা’ রাখার ধারণাও প্রকাশ করেছিলেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। তবে রাষ্ট্রপতির একতরফা নির্দেশে অঙ্গরাজ্যটির নাম পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কারণ নিউ মেক্সিকোর নাম অঙ্গরাজ্যের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য অঙ্গরাজ্যের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এতে অঙ্গরাজ্যের আইনসভা ও ভোটারদের ভূমিকা থাকতে পারে।
মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের প্রশ্নের সঙ্গে এই বিষয়টির আইনি পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন ফেডারেল নথিতে কোনও মহাসাগরের নাম নির্ধারণ এবং একটি অঙ্গরাজ্যের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তন দুটি পৃথক প্রক্রিয়া।
এর উত্তর নির্ভর করে নামটি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। মার্কিন সরকার সরকারি নথি, ফেডারেল সংস্থার রেকর্ড এবং সরকারি মানচিত্রে ভৌগোলিক নামের ব্যবহার নির্ধারণ করতে পারে।

তবে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর বিস্তৃত আন্তর্জাতিক জলভাগের সঙ্গে যুক্ত। এই মহাসাগরগুলির আশপাশে বহু দেশ অবস্থিত। বৈশ্বিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক পরিবহণ, মৎস্য আহরণ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও এগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মার্কিন সরকার কোনও মহাসাগরের জন্য নতুন নাম গ্রহণ করলেও অন্য দেশগুলি নিজেদের সরকারি নথিতে পুরনো নাম ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানচিত্র প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিও নিজেদের নিয়ম ও নীতি অনুযায়ী নাম নির্ধারণ করতে পারে।
অতএব, কোনও মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের ঘোষণা তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামুদ্রিক সীমানা বা তার ওপর কোনও দেশের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন করে না।
এর আগে হরমুজ প্রণালীর নাম নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও অন্যান্য জ্বালানি সম্পদ পরিবহণ করা হয়।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর কৌশলগত গুরুত্বের কারণে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর আন্তর্জাতিক বাজার ও বিভিন্ন দেশ নজর রাখে।
তবে প্রণালীটির নাম ‘ট্রাম্প স্ট্রেট’ রাখার ধারণাকেও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক নামকরণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়। কোনও প্রণালীর নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প জনসভায় নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন, কিন্তু আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের জন্য কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ঘোষণা করেননি। মার্কিন প্রশাসন এই ধারণাকে সরকারি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নিয়ে যাবে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
ভবিষ্যতে এমন কোনও প্রস্তাব পেশ করা হলে তার আইনি পরিধি, সরকারি নথিতে নতুন নামের ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মার্কিন সরকারের কোনও নাম গ্রহণ করা এবং বিশ্বজুড়ে সেই নাম স্বীকৃতি পাওয়া দুটি পৃথক বিষয়।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ভৌগোলিক নামকরণ আবারও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে আপাতত এটিকে আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং একটি প্রকাশ্য প্রস্তাব হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।









