মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আলোচনা জোরদার হয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে সামুদ্রিক পথ স্বাভাবিক করার বিষয়ে শিগগিরই একটি সমঝোতা হতে পারে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করেছেন যে বর্তমান আলোচনা শুধুমাত্র হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়েই সীমাবদ্ধ। তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা হবে। যুক্তরাষ্ট্র পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা।
ইরান নিশ্চিত করেছে যে তারা ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ ও অস্থায়ী সামুদ্রিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় প্রণালীতে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবে ইরান, আর প্রণালী থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোকে বিকল্প পথ দিয়ে ছাড়পত্র দেবে ওমান। তবে কোনো জাহাজকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার আগে ওমান ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে সামুদ্রিক বাণিজ্যে সাময়িক স্বস্তি আসতে পারে। তবে এর সফলতা দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
মার্কো রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্য কেবল বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যকে স্বাভাবিক করা। তিনি স্পষ্ট করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ওয়াশিংটন এখনো চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হোক এবং এ বিষয়ে পৃথক আলোচনা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই বার্তা দিতে চায় যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পারমাণবিক বিরোধ দুটি পৃথক বিষয় এবং একটি বিষয়ে সমঝোতার অর্থ অন্য বিষয়ে অবস্থান শিথিল করা নয়।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী একটি কৌশলগত সামুদ্রিক পথ। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই পথে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধির ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে চলমান আলোচনাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে স্বস্তি দেখা গেছে। মার্কিন ডব্লিউটিআই (WTI) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৬ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা কমবে এবং দামের ওপর চাপ হ্রাস পাবে।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সামুদ্রিক পথ খুলে দেওয়াই যথেষ্ট হবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে হলে জাহাজের মালিক, বীমা কোম্পানি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই আস্থা থাকতে হবে যে ভবিষ্যতে জাহাজের ওপর হামলার ঝুঁকি থাকবে না।
সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, ইরানকে প্রকাশ্যে আশ্বস্ত করতে হবে যে তারা কোনো নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক বা বেসামরিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে না। এমন আশ্বাস না মিললে বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম বাড়াতে পারে অথবা জাহাজের বীমা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে, যার ফলে সামুদ্রিক পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
সামুদ্রিক বাণিজ্য শুধু জাহাজের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে বীমা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। কোনো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ঝুঁকি বেশি বিবেচিত হলে বীমা কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত প্রিমিয়াম আদায় করে। এর ফলে তেল ও অন্যান্য পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বাণিজ্যিক আস্থা পুনর্গঠনও প্রয়োজন।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কয়েকজন সংসদ সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বিরুদ্ধে অভিশংসন আনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা দেশের কৌশলগত স্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ ছাড়া কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং পারমাণবিক কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা সীমিত করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে লোহিত সাগরে ভারতীয় পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। হামলার পর জাহাজটি ডুবে গেলেও তাতে থাকা ১৩ জন ভারতীয় নাগরিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনা পশ্চিম এশিয়ার সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালী নিয়ে স্থায়ী বা অস্থায়ী সমঝোতা হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দামে স্থিতিশীলতা এলে পরিবহন, উৎপাদন এবং অন্যান্য শিল্পের ব্যয় কমতে পারে। অন্যদিকে আলোচনা ব্যর্থ হলে বা অঞ্চলে পুনরায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ওমানের মধ্যে চলমান আলোচনার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে, কারণ এর প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।








