পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিমান হামলা ও ড্রোন হামলার দাবির মধ্যে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলার খবর সামনে এসেছে। উভয় দেশই একে অপরকে পাল্টা পদক্ষেপের সতর্কবার্তা দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধের সূত্রপাত হয় হরমুজ প্রণালীর কাছে, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হিসেবে বিবেচিত। এই অঞ্চলে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার এবং ইরানি ড্রোন তৎপরতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে, তাদের একটি AH-64 অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইরানি পদক্ষেপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। অন্যদিকে, ইরান দাবি করেছে যে ঘটনাটি প্রযুক্তিগত সংঘর্ষ বা ড্রোন-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার ফল হতে পারে।
উত্তেজনা বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সেনাবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ ছিল পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং এর লক্ষ্য ছিল এমন স্থাপনাগুলোকে আঘাত করা, যেখান থেকে মার্কিন সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি তৈরি হচ্ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং নজরদারি রাডার স্থাপনায় নির্দিষ্ট হামলা চালায়। এই সামরিক অভিযান মূলত হরমুজ প্রণালীর আশপাশের এলাকায় কেন্দ্রীভূত ছিল, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন হেলিকপ্টারের ওপর হামলা ছিল ইরানের পদক্ষেপের অংশ এবং এর জবাব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (IRGC) দাবি করেছে, তারা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিকে ড্রোনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
ইরান আরও দাবি করেছে যে তারা একটি মার্কিন MQ-9 রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে মার্কিন সেনাবাহিনী এ দাবির কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেয়নি। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের আঞ্চলিক স্থাপনায় পরিচালিত হামলার জবাব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে ইরান আরও কঠোর জবাব দেবে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন কোনো পরিস্থিতিতেই গ্রহণ করা হবে না।
উত্তেজনার মধ্যে বাহরাইনে এয়ার রেইড সাইরেন বাজানো হয় এবং নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ইরান দাবি করার পর যে তারা বাহরাইনে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিটকে ড্রোনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করেছে, তখন এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন ফিফথ ফ্লিটকে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সামরিক মোতায়েন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা পারস্য উপসাগর এবং আশপাশের কৌশলগত জলপথ পর্যবেক্ষণ করে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো এসব হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
হরমুজ প্রণালী এই সংঘাতের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। এই জলপথ বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশের পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে এবং এখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে অপরিশোধিত তেলের দামে প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড এবং ডব্লিউটিআই উভয়ের দামেই ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের ইঙ্গিত বহন করে।
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান বলেছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় আকারের হামলা চালানো হতে পারে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ছিল একটি বৃহত্তর সামরিক কৌশলের সূচনা।
এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরান আলোচনায় আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি রাজনৈতিক সমাবেশে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে “পূর্ণ বিজয়” ঘোষণা করতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ইতোমধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।








