পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য আলোচনার আগে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে কথিত ড্রোন হামলা, ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক মালবাহী জাহাজে প্রজেক্টাইল হামলা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সতর্কবার্তা নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এসব ঘটনার একাধিক দাবির স্বাধীনভাবে এখনও পর্যন্ত নিশ্চিতকরণ হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে অন্তত তিনটি ড্রোন পাঠিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বা কুয়েত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার বিষয়টি নিশ্চিত হলে তা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর প্রতি বাড়তে থাকা নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) জানিয়েছে, ওমানের খাসাব থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে একটি বাণিজ্যিক মালবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার জন্য কে দায়ী এবং জাহাজটির কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। UKMTO ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে সতর্ক থাকার এবং যেকোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের তথ্য দ্রুত জানাতে পরামর্শ দিয়েছে। ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি এবং আশপাশের এলাকায় যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সামনে সমঝোতার "শেষ সুযোগ" রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বিকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে না।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্ব প্রকাশ্যে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানালেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করছে। তিনি আরও দাবি করেন, হরমুজ অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রস্তাবিত আলোচনার তারিখ ও স্থান এখনও নির্ধারিত হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ও কাতার সম্ভাব্য আয়োজক দেশ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
সূত্রগুলোর মতে, দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক মধ্যস্থতায় ভূমিকা পালন করে আসছে এবং উত্তেজনা কমাতে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। তবে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার সময়সূচি নিশ্চিত করেনি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সামুদ্রিক বাণিজ্য, তেল সরবরাহ এবং কৌশলগত নৌপথে চাপ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন কৌশল গ্রহণ করা হলে তার উদ্দেশ্য হবে বৃহৎ পরিসরের যুদ্ধ এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বৃদ্ধি করা।

IRGC দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি MQ-9 Reaper ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করেছে।
তবে ড্রোনটি কোন দেশের ছিল, তা IRGC স্পষ্ট করেনি। যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশও এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। ফলে দাবিটির স্বাধীন নিশ্চিতকরণ এখনও বাকি রয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য সম্ভাব্য নতুন পদক্ষেপ নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মার্কিন স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত বিকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হুমকির পর ছয়টি সৌদি সুপারট্যাঙ্কার লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব রুট এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল ঘুরে দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিবর্তনের ফলে যাত্রার সময় ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এবং শিপিং শিল্পের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার খবর প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে তাদের আলোচনা কেবল ওমানের সঙ্গে হচ্ছে।
ইরান দাবি করেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন প্রকৃত পরিস্থিতি সঠিকভাবে উপস্থাপন করছে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, বিভিন্ন মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো সামরিক বা নিরাপত্তাজনিত সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য, বীমা ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার দিকে নজর রাখছে। আলোচনার সফলতা উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে, তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।








