উত্তরপ্রদেশে এ বছর স্বাভাবিক সময়ের প্রায় ১০ দিন আগে বর্ষার বিদায় শুরু হতে পারে। দুর্বল মৌসুমি কার্যকলাপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরে ফের শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া এল নিনোর ইঙ্গিত নিয়ে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতে এ বছর বর্ষা ইতিমধ্যেই দুর্বল রয়েছে। ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সাম্প্রতিক আবহাওয়া মূল্যায়নে সেপ্টেম্বরে বৃষ্টির ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা জানানো হয়েছে, যার ফলে স্বাভাবিক সময়ের আগেই বর্ষার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আবহাওয়া দফতরের মতে, বর্ষার প্রত্যাবর্তন নির্দিষ্ট একটি তারিখে গোটা দেশ থেকে একসঙ্গে হয় না। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধাপে ধাপে বর্ষা সরে যায়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে বর্ষার প্রত্যাবর্তন শুরু হয় এবং পরে ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য অংশ থেকেও বর্ষা পিছিয়ে যায়। আইএমডির সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী, বর্ষার প্রত্যাবর্তন ঘোষণা করার জন্য টানা পাঁচ দিন বৃষ্টির কার্যকলাপ কমে যাওয়া, নিম্ন ট্রপোস্ফিয়ারে অ্যান্টি-সাইক্লোনিক সার্কুলেশন এবং আর্দ্রতা কমে যাওয়ার মতো সংকেত দেখা হয়।
উত্তরপ্রদেশে বর্ষার বিদায়ের প্রভাব সরাসরি আবহাওয়ার ধরনে দেখা যেতে পারে। বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়লে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে শুরু করে এবং দিনের তাপমাত্রা ফের বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্ষা সরে যাওয়ার পরই তাপপ্রবাহ শুরু হবে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় আবহাওয়া ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির পর্ব অব্যাহত থাকতে পারে।
এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে এল নিনো নিয়ে। প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত এল নিনো পরিস্থিতি ভারতীয় বর্ষায় প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা ২০২৬ সালে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর ফলে ভারতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এর প্রভাব শুধু বর্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। শক্তিশালী এল নিনো আগামী মাসগুলিতে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনও একটি আবহাওয়া পরিস্থিতির ভিত্তিতে পুরো শীতকাল সম্পর্কে নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। শীতের প্রকৃত পরিস্থিতিতে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা, হিমালয়ে তুষারপাত, প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থারও প্রভাব থাকবে।
উত্তরপ্রদেশে বর্ষার প্রত্যাবর্তন দ্রুত হলে সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয়ার্ধে বৃষ্টির কার্যকলাপ কমে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষিজমি এবং খরিফ ফসলের ওপর। এই সময়ে ধান, ভুট্টা, বাজরা, ডাল এবং অন্যান্য খরিফ ফসলের জন্য বৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়লে যে সব এলাকায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি, সেখানে কৃষকদের সেচের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
দেশে এ বছর বৃষ্টির পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই দুর্বল। রিপোর্ট অনুযায়ী, জুনে সারা দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৫.৪ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল। আগস্টেও ঘাটতি রেকর্ড হয়েছে। জুলাইয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু পুরো মৌসুমি বৃষ্টিপাত এখনও স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে।
উত্তরপ্রদেশে এর প্রভাব বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন হতে পারে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বর্ষার কার্যকলাপ দুর্বল হলে তাপমাত্রায় দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। অন্যদিকে পূর্ব উত্তরপ্রদেশে স্থানীয় আবহাওয়া ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির কয়েকটি পর্ব অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে গোটা রাজ্যে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বর্ষার দ্রুত বিদায়ের আরেকটি প্রভাব জলসম্পদের ওপর পড়তে পারে। যে সব এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে, সেখানে পুকুর, ছোট নদী এবং ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ প্রভাবিত হতে পারে। বৃষ্টির দিনের সংখ্যা কমে গেলে মাটিতে পর্যাপ্ত জল সঞ্চিত হয় না। এর প্রভাব পরবর্তী মাসগুলিতে সেচ এবং পানীয় জলের ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।
কৃষকদের জন্য সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ খরিফ ফসলের শেষ বিকাশপর্বে জলের প্রয়োজন হয়। এই সময়ে বৃষ্টি দ্রুত শেষ হলে ফসলের অবস্থা বজায় রাখতে কৃষকদের নিজস্ব সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা নেই এমন কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
অন্যদিকে, যে সব এলাকায় বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে, সেখানে দ্রুত বর্ষার বিদায় জলাবদ্ধতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে বৃষ্টির বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। গোটা রাজ্যে মোট বৃষ্টির পরিমাণই কৃষক এবং সাধারণ মানুষের ওপর আবহাওয়ার প্রভাব নির্ধারণ করে না।
এখন প্রশ্ন, এ বছর শীত কেমন হবে। এল নিনো শক্তিশালী হলে ভারতের আবহাওয়ার ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তবে এখনই উত্তরপ্রদেশে তীব্র শীত পড়বে নাকি স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ শীত হবে, তা বলা তাড়াহুড়ো হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, শীতের মূল্যায়নে একাধিক আবহাওয়া ব্যবস্থা বিবেচনা করা হয়।
এল নিনোর কারণে সাধারণভাবে ভারতে বৃষ্টিপাত দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আইএমডির তথ্য অনুযায়ী, ENSO বা এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন ভারতীয় বর্ষায় বছরভিত্তিক পরিবর্তনের একটি প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোলসহ একাধিক সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিও বর্ষাকে প্রভাবিত করে।
শীতের ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব সরাসরি এবং প্রতি বছর একই রকম হয় না। ঠান্ডার তীব্রতায় পশ্চিমী ঝঞ্ঝার সংখ্যা ও শক্তি, হিমালয় অঞ্চলে তুষারপাত এবং উত্তর ভারতে বাতাসের দিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাই এখন শুধু এল নিনোর ভিত্তিতে এ বছর উত্তরপ্রদেশে ঠান্ডা কম পড়বে বলে দাবি করা যথাযথ হবে না।
তবে আবহাওয়াবিদদের কাছে এল নিনোর শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর প্রভাব পরবর্তী মৌসুমগুলির বৃহত্তর আবহাওয়া প্রবণতার ওপর পড়তে পারে। ২০২৬ সালে এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোচনা বেড়েছে। কিছু বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে বছরের শেষ নাগাদ এটি যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা জানানো হয়েছে।
বর্ষা দ্রুত ফিরে গেলে এবং বৃষ্টির ঘাটতি বজায় থাকলে সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় আবহাওয়া তুলনামূলক শুষ্ক হতে পারে। এই সময়ে দিনে রোদ বেশি অনুভূত হতে পারে, অন্যদিকে সকাল ও রাতের তাপমাত্রায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হতে পারে। অক্টোবরের পর আবহাওয়ায় শীতলতা বাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তবে প্রকৃত শীত আসার সময় বিভিন্ন বছরে পরিবর্তিত হয়।
উত্তরপ্রদেশে শীতকালে কুয়াশাও একটি গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া পরিস্থিতি। বিশেষ করে পূর্ব উত্তরপ্রদেশ এবং গঙ্গার সমভূমি অঞ্চলে আর্দ্রতা ও বাতাসের পরিস্থিতি অনুকূল হলে ঘন কুয়াশা দেখা যায়। এ বছর কুয়াশা ও ঠান্ডার পরিস্থিতি কেমন হবে, তার ভালো অনুমান অক্টোবর-নভেম্বরে আবহাওয়া ব্যবস্থার পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার পরই করা সম্ভব হবে।
বর্ষার দ্রুত বিদায়ের প্রভাব উৎসবের মরসুমেও পড়তে পারে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আবহাওয়া শুষ্ক থাকলে বাইরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বৃষ্টির সমস্যা কমতে পারে। তবে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকলে গরমের অনুভূতি বজায় থাকতে পারে। অক্টোবরে উত্তর ভারতে আবহাওয়ার পরিবর্তন দ্রুত হয় এবং দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য বাড়তে শুরু করে।
আবহাওয়া দফতর বর্ষার অগ্রগতি ও প্রত্যাবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। আইএমডির ওয়েবসাইটে বর্ষার কার্যকলাপ, বৃষ্টির পরিসংখ্যান, বর্ষার প্রত্যাবর্তন এবং ENSO পরিস্থিতি সম্পর্কিত আপডেট দেওয়া হয়।
এই পুরো মৌসুমে শুধু মোট বৃষ্টির পরিমাণ নয়, তার বণ্টনও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। সেপ্টেম্বরে কিছু এলাকায় ভালো বৃষ্টি হলে সেখানে ফসল ও জলসম্পদের পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে কম বৃষ্টিপ্রাপ্ত এলাকায় জলের ঘাটতির সমস্যা বাড়তে পারে।
উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের এখন পরবর্তী আবহাওয়া আপডেটের দিকে নজর রাখতে হবে। যে সব এলাকায় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা রয়েছে, সেখানে দ্রুত বর্ষার প্রত্যাবর্তনে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ক্ষতি নাও হতে পারে। তবে বৃষ্টির ঘাটতি থাকা এলাকায় সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছেও খরিফ ফসলের শেষ পর্যায়ের জন্য সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
বর্তমানে বর্ষার দ্রুত বিদায়ের সম্ভাবনা এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো আবহাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশে এ বছর বৃষ্টিপাত ইতিমধ্যেই স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে এবং দুর্বল বর্ষার কারণে সেপ্টেম্বরে ঘাটতি আরও বাড়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উত্তরপ্রদেশে বর্ষার দ্রুত প্রত্যাবর্তন কৃষক এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শীত নিয়ে এখনও চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট নয়। এল নিনো শক্তিশালী হলে আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়ে, কিন্তু উত্তরপ্রদেশে ঠান্ডার তীব্রতা, কুয়াশার পরিমাণ এবং শৈত্যপ্রবাহের পর্ব কতগুলি হবে, তার নির্ভরযোগ্য অনুমান পরবর্তী মাসগুলিতে করা সম্ভব হবে। আপাতত আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের নজর রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি, বর্ষার প্রত্যাবর্তন এবং সেপ্টেম্বরে বৃষ্টির ওপর।
সামগ্রিকভাবে এ বছর উত্তরপ্রদেশের আবহাওয়ায় বর্ষার দ্রুত বিদায় এবং এল নিনোর শক্তিশালী হওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। বর্ষা যদি সত্যিই স্বাভাবিক সময়ের প্রায় ১০ দিন আগে বিদায় নেয়, তাহলে সেপ্টেম্বরের পর রাজ্যে আবহাওয়া দ্রুত শুষ্ক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, শীত নিয়ে এখনই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে আগামী মাসগুলির আবহাওয়া সংকেতের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন।











