উত্তরপ্রদেশে বৃষ্টি ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধি, বারাবাঁকিতে সরযূ ভাঙন বদায়ুঁতে ঘন কুয়াশা

উত্তরপ্রদেশে টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন জেলায় জলাবদ্ধতা ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বারাবাঁকিতে সরযূ নদীর ভাঙনে ধর্মীয় স্থাপনা ও বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বদায়ুঁতে সোত নদীর জল সড়কের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ঘন কুয়াশা দেখা দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশে বৃষ্টি ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধি, বারাবাঁকিতে সরযূ ভাঙন বদায়ুঁতে ঘন কুয়াশা
Photo Credit / Attribution: Google

উত্তরপ্রদেশে সেপ্টেম্বরের শেষ দিনগুলিতে আবহাওয়ার আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। রাজ্যের একাধিক এলাকায় একসঙ্গে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং কুয়াশার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। টানা বৃষ্টির পর বিভিন্ন জেলায় নদীর জলস্তর বেড়েছে এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনও তীব্র হয়েছে। বারাবাঁকিতে সরযূ নদীর প্রবল স্রোতে নদীতীরের ধর্মীয় স্থাপনা ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বদায়ুঁতেও সোত নদীর জলস্তর বাড়ায় সড়ক ও যোগাযোগপথের উপর দিয়ে জল প্রবাহিত হয়েছে। অন্যদিকে, বৃষ্টির পর পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কিছু এলাকায় সকালে আচমকা ঘন কুয়াশা দেখা দেয়।

গত কয়েক দিন ধরে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অংশে টানা বৃষ্টি চলছে। ভারী বৃষ্টির কারণে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বহু জায়গায় রাস্তা জলের নিচে চলে গেছে, নিচু এলাকায় বাড়িঘরে জল ঢুকেছে এবং মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েছে। রাজ্যে গত প্রায় ৬০ ঘণ্টায় অতিবৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। উপলব্ধ রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সময়ে ৫৬ জনের মৃত্যু, ৪৬ জনের আহত হওয়া এবং ১,০২১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল।

বৃষ্টির পর আবহাওয়ার পরিবর্তিত রূপ বদায়ুঁতে স্পষ্ট হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে জেলায় আচমকা ঘন কুয়াশা নামে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিনগুলিতে এমন ঘন কুয়াশা দেখে স্থানীয় বাসিন্দারাও বিস্মিত হন। সকাল প্রায় ৬টার দিকে শহর ও আশপাশের এলাকায় দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির চালকদের আলো জ্বালিয়ে এগোতে হয়। টানা বৃষ্টির পর বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং সকালের তাপমাত্রার পরিবর্তনের মধ্যে এই কুয়াশার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

কুয়াশার প্রভাব শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রামীণ এলাকার মাঠ, রাস্তা এবং খোলা জায়গাতেও ধোঁয়াশা দেখা যায়। সাধারণত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে উত্তরপ্রদেশের অধিকাংশ এলাকায় গরম ও আর্দ্রতার প্রভাব থাকে। কিন্তু এ বার টানা বৃষ্টির কারণে আবহাওয়ার ধরন বদলে গেছে। বদায়ুঁতে সকালে মানুষ হালকা ঠান্ডাও অনুভব করেন। কম দৃশ্যমানতার কারণে গাড়িচালকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

এই বৃষ্টির মধ্যেই বারাবাঁকিতে সরযূ নদীর জলস্তর ও স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়েছে। নদীর তীব্র ভাঙনে হেতমাপুর এলাকায় নদীতীরবর্তী ধর্মীয় স্থাপনা ও একাধিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাইভ হিন্দুস্তানের রিপোর্ট অনুযায়ী, একটি মসজিদ, শিব মন্দির এবং প্রায় ১০টি বাড়ি নদীর স্রোতে তলিয়ে গেছে। অন্যান্য রিপোর্টেও নদীভাঙনে ধর্মীয় স্থাপনা এবং বিপুল সংখ্যক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।

নদীর স্রোত যে গতিতে তীরের জমি ভাঙছে, তাতে আশপাশের বাসিন্দাদের উদ্বেগ বেড়েছে। গ্রামবাসীদের বাড়ি থেকে জিনিসপত্র সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় যেতে হয়েছে। কৃষিজমি ও বসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে ভাঙন ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। নদীতীরবর্তী পরিবারগুলিকে নিরাপদ রাখা এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া প্রশাসনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বারাবাঁকিতে আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, এডিএম নিরঙ্কার সিং, এসপি অর্পিত বিজয় বর্গীয়, এএসপি বিবেক তিওয়ারি এবং অন্যান্য আধিকারিক হেতমাপুরে পৌঁছেছিলেন। এসডিএম ও তহসিলদারও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনিক দল নদীর স্রোত ও ভাঙনের পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে।

নদীর জলস্তর বৃদ্ধির পেছনে ব্যারাজ থেকে জল ছাড়াকেও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বারাবাঁকি বন্যা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, গিরজা ব্যারাজ ও শারদা ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার কারণে ঘাঘরা-সরযূ নদীর জলস্তর বেড়েছে এবং নদী প্রবল স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রশাসন ও সেচ বিভাগের দল নদীতীরে উদ্ধার ও প্রতিরোধমূলক কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

বারাবাঁকিতে নদীভাঙনে ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি গ্রামীণ জনবসতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক বাড়ি নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সামনে বসবাসের সমস্যা তৈরি হয়েছে। গ্রামবাসীদের দাবি, নদীর স্রোত ক্রমাগত জমি কেটে নিয়ে যাচ্ছে এবং একই গতিতে ভাঙন চলতে থাকলে আশপাশের আরও বাড়ি ও ধর্মীয় স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। প্রশাসনের তরফে সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে নজরদারি ও উদ্ধারকাজ চলছে।

এদিকে বদায়ুঁতেও বৃষ্টি ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধির কারণে সড়ক যোগাযোগ প্রভাবিত হয়েছে। সোত নদীর জলস্তর বাড়ায় বিসৌলি-সহসওয়ান সড়কে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, শাহবাদ-কাছলা মহাসড়কের রানেট চৌরাস্তার কাছে বিলসি-ইসলামনগর সড়কের বিকল্প ডাইভারশন পথে নদীর জল রাস্তার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে পথচারীদের জন্য ওই রাস্তা পার হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

টানা বৃষ্টির কারণে বদায়ুঁ জেলায় এর আগেও ব্যাপক জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। দুই দিনে ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হওয়ার রিপোর্ট রয়েছে। বৃষ্টির কারণে প্রধান সড়ক থেকে মহল্লার গলি পর্যন্ত জল জমে যায়। খরিফ ফসলেরও ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। একাধিক জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।

বদায়ুঁ শহরের নিচু এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে জল জমে বাসিন্দাদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। জোগীপুরা, গান্ধী গ্রাউন্ড রোড, নেকপুর, পানওয়াড়ি, শিবপুরম এবং জওহরপুরী এলাকায় জলাবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে। একাধিক জায়গায় নালা উপচে পড়ায় বৃষ্টির জল নিষ্কাশন ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টি এবং মাটিতে আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে গাছ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে।

বদায়ুঁতে বৃষ্টির সময় ডিএম রোডে একের পর এক গাছ পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়। গাছ পড়ে বিদ্যুতের লাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। রাস্তায় গাছ পড়ে যাওয়ায় গাড়িচালকদের সমস্যায় পড়তে হয় এবং কিছু সময়ের জন্য পথ বন্ধ রাখতে হয়। টানা বৃষ্টির মধ্যে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের দল রাস্তা পরিষ্কার করে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ করে।

উত্তরপ্রদেশের অন্যান্য এলাকাতেও বৃষ্টি ও নদীর জলস্তর বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। কুশীনগরে নেপাল থেকে জল ছাড়ার পর নারায়ণী অর্থাৎ গণ্ডক নদীতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রয়াগরাজ অঞ্চলে টানা বৃষ্টি এবং মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা নদীগুলির জলস্তর বৃদ্ধির প্রভাব দেখা গেছে। কেন, বেতওয়া ও টনস নদীর জলস্তর বৃদ্ধির ফলে যমুনার উপরও চাপ বেড়েছে বলে জানা গেছে।

বারাণসীতেও বৃষ্টির প্রভাব যান চলাচলে পড়েছে। জাতীয় সড়ক-১৯-এ আখরি থেকে ভিখারিপুরের মধ্যে একাধিক জায়গায় জল জমার খবর পাওয়া গেছে। রাস্তায় জল জমে থাকা এবং বিভিন্ন জায়গায় গর্ত থাকায় গাড়িচালকদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বৃষ্টির জল নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়ায় রাস্তায় চলাচলকারী দুই চাকার যান ও অটোচালকদের ঝুঁকি বেড়েছে।

আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশের একাধিক জেলায় বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিম ও পূর্ব—উভয় অংশের একাধিক জেলাকে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকার মধ্যে রাখা হয়েছে। মেরঠ, বদায়ুঁ, আলিগড়, বেরেলি, মোরাদাবাদ, বারাণসী, প্রয়াগরাজ, গোরখপুর, অযোধ্যা, দেওরিয়া এবং কুশীনগর-সহ একাধিক জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। পূর্ব উত্তরপ্রদেশে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টির কার্যকলাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাও জানানো হয়েছে।

তবে আবহাওয়ার কার্যকলাপ ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। একটি আবহাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বরের পর উত্তরপ্রদেশে বৃষ্টির কার্যকলাপ কমতে পারে এবং তাপমাত্রা বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী দিনে জলাবদ্ধ এলাকাগুলিতে জল কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙন ও জলস্তরের পরিস্থিতির উপর নজর রাখা প্রয়োজন হবে।

বৃষ্টির এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের উদ্বেগও বেড়েছে। মাঠে আগে থেকেই থাকা আর্দ্রতার মধ্যে টানা বৃষ্টি হলে ধান ও অন্যান্য খরিফ ফসল প্রভাবিত হতে পারে। যে এলাকাগুলিতে দীর্ঘ সময় ধরে জমিতে জল জমে থাকবে, সেখানে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকবে। প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সামনে এখন ফসলের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তৈরি করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

এই মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশের একাধিক জেলায় বৃষ্টির পর তৈরি পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। কোথাও নদীর জল রাস্তার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, কোথাও মাঠে জল জমে রয়েছে এবং কোথাও নদীতীরের ভাঙন ক্রমাগত জমি গ্রাস করছে। বারাবাঁকিতে সরযূ নদীর ভাঙন এবং বদায়ুঁতে সোত নদীর জলস্তর বৃদ্ধি দেখিয়েছে যে বৃষ্টি থেমে গেলেও বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় না। প্রশাসনের দলগুলি সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে নজর রাখছে এবং জলাবদ্ধ বা প্রবল স্রোতের রাস্তায় অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নেওয়ার জন্য মানুষকে আবেদন জানানো হচ্ছে।

Leave a comment