মধেপুরায় গুলিতে নরদহ পঞ্চায়েতের মুখিয়া প্রতিনিধির মৃত্যু

মধেপুরার পুরৈনীতে গুলিবর্ষণে নরদহ পঞ্চায়েতের মুখিয়া প্রতিনিধি বিকাশ কুমার ওরফে বিক্কি মেহতার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা ছিল এবং জুলাই ২০২৫ থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সিসিএ জারি ছিল।
মধেপুরায় গুলিতে নরদহ পঞ্চায়েতের মুখিয়া প্রতিনিধির মৃত্যু
Photo Credit / Attribution: Google

সোমবার সন্ধ্যায় মধেপুরার পুরৈনী থানা এলাকার নতুন টোলা চক সংলগ্ন এলাকায় গুলিবর্ষণে নরদহ পঞ্চায়েতের মুখিয়ার দেওর এবং মুখিয়া প্রতিনিধি বিকাশ কুমার ওরফে বিক্কি মেহতার মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিক্কি মেহতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১৬টি মামলা ছিল এবং জুলাই ২০২৫ থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সিসিএ জারি ছিল।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যায় নতুন টোলা মধ্য বিদ্যালয়ের মাঠে নির্মাণাধীন বাউন্ডারিওয়ালের কাজ দেখে বিক্কি মেহতা বাইকে করে যোগীরাজে নিজের বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। নতুন টোলা চক সংলগ্ন এলাকায় হামলাকারীরা প্রথমে তার বাইকে ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দেয়। এরপর গুলি চালানো হয়।

গুলি লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে বিক্কি কিছুটা দূরে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা দুষ্কৃতীরা তাকে ফের ঘিরে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে যান।

হামলাকারীর সংখ্যা এবং গুলিবর্ষণের রাউন্ড নিয়ে পুলিশ ও স্থানীয় রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। হিন্দুস্তানের প্রতিবেদনে তিনটি বাইকে ছয়জন দুষ্কৃতীর হামলার কথা বলা হয়েছে। অন্য স্থানীয় রিপোর্টে প্রথমে একজন হামলাকারীর গুলি চালানো এবং পরে বাইকে থাকা দুষ্কৃতীদের ঘিরে ফেলার কথা উল্লেখ রয়েছে। গুলির সংখ্যাও বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ২০ রাউন্ডের বেশি গুলি চালানোর দাবি এই পর্যায়ে পুলিশের চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরা যাচ্ছে না।

গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়ার পর আহত বিক্কিকে পুরৈনী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে মধেপুরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়।

তবে মেডিকেল কলেজে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। মেডিকেল কলেজের উপাধীক্ষক ডা. প্রিয়রঞ্জন ভাস্করের মতে, বিক্কিকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তার শরীরে পাঁচ-ছয়টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার খবর পেয়ে পুরৈনী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদাকিশুনগঞ্জের এসডিপিও পবন কুমারসহ পুলিশ আধিকারিকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে পুলিশের একাধিক দল তদন্তে নামে।

হামলাকারীদের শনাক্ত করতে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি অপরাধীদের সম্ভাব্য আস্তানায় তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে।

পুলিশ ঘটনাস্থলের বিভিন্ন অংশও পরীক্ষা করছে। সেখানে খালি কার্তুজ বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী পাওয়া গেলে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে অস্ত্র এবং হামলার পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে হামলাকারীদের বাইক, তাদের সংখ্যা, আসা-যাওয়ার দিক এবং পালানোর পথ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

হত্যার কারণ এখনও নিশ্চিত করেনি পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুরনো শত্রুতা এবং পারস্পরিক বিরোধের দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলাকারীরা প্রথমে বিক্কিকে ফেলে দেওয়ার পর তার পালানোর সময় ফের ঘিরে গুলি চালিয়েছে বলে যে তথ্য রয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

ঘটনাটি আগে থেকে পরিকল্পিত ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এটি এখনও তদন্তের বিষয় এবং কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।

বিক্কি ঘটনার আগে কয়েক দিন ধরে নতুন টোলা মধ্য বিদ্যালয়ের মাঠে চলা বাউন্ডারিওয়াল নির্মাণের কাজ দেখতে যাচ্ছিলেন। পুলিশ তদন্তে এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে পারে যে সেদিন তিনি সেখানে আসবেন, সে তথ্য কার কার কাছে ছিল। তার মোবাইল ফোনের কল ডিটেল, যোগাযোগ এবং ঘটনার সময়কার লোকেশনও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

হিন্দুস্তানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্কি মেহতা তার ভাইয়ের স্ত্রী রীতা দেবীকে নরদহ গ্রাম পঞ্চায়েতের মুখিয়া করতে সহযোগিতা করেছিলেন এবং মুখিয়া প্রতিনিধি হিসেবে পঞ্চায়েত-সংক্রান্ত কাজে সক্রিয় ছিলেন। তার বাবা চন্দেশ্বরী মেহতার প্যাক্স নির্বাচনে জয়ের কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পঞ্চায়েত রাজনীতিতে তার ভূমিকা এবং পুরনো অপরাধমূলক রেকর্ডের বিষয়টি সামনে রেখে পুলিশ একাধিক দিক থেকে তদন্ত করছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা থাকলেও পুলিশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

মধেপুরার এসপি সন্দীপ সিংহের তথ্য অনুযায়ী, বিক্কি মেহতার বিরুদ্ধে জেলার বিভিন্ন থানায় ১৬টি মামলা নথিভুক্ত ছিল। পুলিশ আরও জানিয়েছে, প্রায় ছয় মাস তার বিরুদ্ধে সিসিএ জারি ছিল। জুলাই ২০২৫ থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তার ওপর সিসিএ কার্যকর ছিল।

তবে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত থাকা মানেই প্রতিটি মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়।

বিক্কি মেহতার নাম একটি আরজেডি নেতার হত্যার মামলার সঙ্গে যুক্ত থাকার দাবিও দেওয়া তথ্যে রয়েছে। তবে পাওয়া সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলিতে তার ১৬টি ফৌজদারি মামলা এবং সিসিএ-র তথ্যের সমর্থন মিললেও আরজেডি নেতার হত্যার ওই নির্দিষ্ট মামলার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই পুলিশ রেকর্ড বা সরকারি বক্তব্য ছাড়া এই দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।

হত্যার পর নতুন টোলা চক থেকে বিক্কির বাড়ি পর্যন্ত পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়। ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় জমে এবং এলাকায় আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, হত্যার পেছনে রাজনৈতিক বা পঞ্চায়েত স্তরের শত্রুতা থাকতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তাদের ভূমিকা পুলিশি তদন্তের পরই নিশ্চিত করা সম্ভব। পুলিশ এখনও এই মামলায় কোনও অভিযুক্তকে গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি।

এসপির নির্দেশে পুলিশের দলগুলো তদন্ত চালাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া প্রমাণ এবং স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হামলাকারীরা কোন পথে এসেছিল এবং হত্যার পর কোন দিকে পালিয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই হত্যাকাণ্ডে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া প্রমাণ এবং পুলিশি তদন্তের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হবে। এগুলোর ভিত্তিতেই হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত এবং হত্যার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা স্পষ্ট হবে।

Leave a comment