এক সময়ের বস্তির জীবন, প্রতিদিনের লড়াই আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই বড় হয়ে ওঠা এক ছেলের আজ বিশ্বমঞ্চে জয়যাত্রা। অভিনেতা বিশাল জেঠওয়ার অভিনীত ছবি হোমবাউন্ড এবার জায়গা করে নিয়েছে অস্কারের শর্টলিস্টে। এই খবর শুধু এক অভিনেতার নয়, বরং এক অদম্য সংগ্রামের স্বীকৃতি।
‘মর্দানী ২’ থেকে অস্কারের দৌড়
রানি মুখোপাধ্যায়ের বিপরীতে মর্দানী ২-এ কিশোর অপরাধী ‘সানি’-র চরিত্রে বিশাল জেঠওয়ার হিমশীতল অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে। ছোটপর্দা থেকে বড়পর্দায় উঠে আসা এই অভিনেতা তখনই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—তিনি আলাদা। সেই অভিনয় যাত্রাই এবার পৌঁছল অস্কারের দরজায়।
‘হোমবাউন্ড’ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
অস্কার ২০২৬-এর (৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস) সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে ভারতের পক্ষ থেকে শর্টলিস্টে জায়গা পেয়েছে হোমবাউন্ড। ঈশান খট্টর ও জাহ্নবী কপূরের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিশাল জেঠওয়া। ২০২৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হওয়া এই ছবি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত।
অভাবের শৈশব, কঠিন বাস্তব
১৯৯৪ সালের ৬ জুলাই গুজরাতে জন্ম বিশালের। বাবা নরেশ জেঠওয়া ও মা প্রীতি জেঠওয়ার সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। জীবিকার খোঁজে মুম্বইয়ে এসে ডাব বিক্রি শুরু করেন নরেশ। ঘিঞ্জি চালে দিন কাটত পরিবারের। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মুম্বইয়ে থিতু হওয়ার আগেই আচমকা মৃত্যু হয় বাবার।
মায়ের লড়াইই ছিল ভিত
স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের ভার এসে পড়ে প্রীতি জেঠওয়ার কাঁধে। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকায় পরিচারিকার কাজ করে তিন সন্তানকে মানুষ করেন তিনি। অপমান, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা—সবকিছু সহ্য করেও সন্তানদের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরেছিলেন এই মা।
থিয়েটার থেকে টেলিভিশন
মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে মুম্বইয়ের ঠাকুর কলেজ অফ কমার্স থেকে স্নাতক হন বিশাল। কলেজ জীবনেই থিয়েটারের প্রতি টান জন্মায়। অভিনয়ের সুযোগ পেতে প্রযোজনা সংস্থার দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, কখনও স্পট বয়, কখনও লাইট ধরার কাজ করেছেন। অবশেষে ২০১৩ সালে টেলিভিশনে অভিনয়ের সুযোগ আসে।
ধারাবাহিক থেকে বড়পর্দা
‘মহারানা প্রতাপ’, ‘দিয়া অউর বাতি হাম’, ‘পেশওয়া বাজিরাও’-এর মতো ধারাবাহিকে কাজ করে পরিচিতি পান বিশাল। বড়পর্দায় অভিষেক মর্দানী ২-এর মাধ্যমে। পরে সালাম ভেঙ্কি, টাইগার ৩ এবং ওয়েব সিরিজ় হিউম্যান-এ তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে।
মায়ের সঙ্গে বিদেশ সফর—সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
অস্কার শর্টলিস্টিংয়ের খবর পেয়ে প্রথমেই মাকে ফোন করেছিলেন বিশাল। তাঁর কথায়, কানে নিজের ছবির প্রদর্শনী যেমন গর্বের, তেমনই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি প্রথমবার মাকে সঙ্গে নিয়ে বিজ়নেস ক্লাসে বিদেশ সফর। এক সময় যা ছিল কেবল কল্পনা, আজ তা বাস্তব।
অভাব-সংগ্রাম পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় সিনেমার মুখ। অভিনেতা বিশাল জেঠওয়া অভিনীত ছবি হোমবাউন্ড জায়গা করে নিল অস্কারের শর্টলিস্টে। এক সময় যাঁর মা পরিচারিকার কাজ করতেন, বাবা ডাব বিক্রি করতেন—সেই পরিবারের ছেলের আজকের এই সাফল্য রীতিমতো অনুপ্রেরণার গল্প।













