শীত পড়তেই পূর্ব বর্ধমান, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল ও মালভূমি এলাকার বাজারগুলোতে দেখা মিলছে টকমিষ্টি বুনো কুল বা বনকুলের। ঝোপঝাড়ে জন্মানো এই ক্ষুদ্রাকৃতির কুল সহজেই ছাড়িয়ে দিচ্ছে আপেল কুল, চেরি কুল বা অন্যান্য হাইব্রিড জাতকে। দাম বেশি হলেও স্বাদ, গন্ধ এবং শীতের বিশেষ নোনতা–ঝাল মাখার সঙ্গে তার মেলবন্ধনই ক্রেতাদের বারবার টানছে এই বুনো কুলের দিকে।

বনে জন্ম, স্বাদে শ্রেষ্ঠ—বুনো কুলের রাজত্ব
রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে কুলের একাধিক হাইব্রিড জাত মিললেও বনকুলের স্বাদ আলাদা। অজয় নদী, দামোদর নদী এবং দুর্গাপুরের পার্শ্ববর্তী ঝোপঝাড়ে স্বাভাবিকভাবে জন্মায় এই ক্ষুদ্র আকারের কুল। প্রকৃতির মাটির গন্ধ মেশা এই কুলের বিশেষ টকমিষ্টি স্বাদই তাকে আলাদা মহিমা দিয়েছে। কুল প্রেমীরা বলেন, ‘‘বনকুলের গন্ধই আলাদা, মুখে দিলে বুঝতে পারবেন এ শুধু কুল নয়, শীতের স্মৃতি।’’
ঝোপঝাড়ে কাঁটাঝোপ—সংগ্রহ করতে রক্তপাত অবধারিত
বনকুল তুলতে হয় সরু ও কাঁটায় ভরা ঝোপ থেকে। প্রতিটি গাছে থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র কাঁটা, যা হাত ভেদ করে রক্ত বের হওয়া পর্যন্ত অবস্থার সৃষ্টি করে। স্থানীয় বিক্রেতাদের মতে, ‘‘যত কাঁটা, তত ফলন।’’ তাই গাছ থেকে কুল তোলার কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গ্রামের বহু মহিলা ভোররাতে নদীর পাড় এবং মালভূমি এলাকা থেকে এই বুনো কুল সংগ্রহ করেন। কষ্ট করেই তারা বাজারে এনে বিক্রি করেন, আর সেই শ্রমের প্রতিদান হিসেবেই বনকুলের দাম থাকে হাইব্রিডের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

দাম বেশি, কিন্তু স্বাদের টানেই ক্রেতার ভিড়
হাইব্রিড কুলের বাজারমূল্য যেখানে সাধারণত কম, সেখানে বনকুলের দাম প্রায় দ্বিগুণ। তবুও কুলপ্রেমীরা দাম নিয়ে মাথা ঘামান না। কারণ বনকুলের স্বাদে আছে আলাদা মাদকতা—একটু টক, একটু মিষ্টি, আর একটু বুনো ঝাঁজ। শীতের রোদে বট বা পলাশ পাতার ঠোঙায় নুন, কাঁচা লঙ্কা আর সরষের তেল মাখানো বনকুল খেতে অপূর্ব লাগে বলেই দাবি করেন বহু ভোক্তা।

দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে বাড়ছে চাহিদা—স্কুল, পার্ক, পিকনিক স্পটই বিক্রির বড় জায়গা
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল এবং পূর্ব বর্ধমানের বহু এলাকায় শীত পড়তেই স্কুলের সামনে, পার্কে, নদীর ধার বা পিকনিক স্পটে দেখা যায় বুনো কুল বিক্রেতাদের। বেতের ঝুড়িতে কুল, কামরাঙা, পেয়ারা সহ বিভিন্ন ফল নিয়ে ঘুরে বেড়ান গ্রামের মহিলারা। শীতের পিকনিক মৌসুমে বনকুলের চাহিদা এতটাই বাড়ে যে সকালেই প্রায় সব বিক্রি হয়ে যায়।
হাইব্রিড কুলের যুগেও বেঁচে আছে দেশি স্বাদ
গত কয়েক বছরে আপেল কুল, এলাচ কুল, ভারত সুন্দরী কুল, চেরি কুলের মতো হাইব্রিড জাতের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। কিন্তু সব হাইব্রিডকে এক ধাক্কায় পিছনে ফেলে দিয়েছে এই 'বুনো কুল'। কৃষিবিদরাও মনে করেন, বনকুলের টকমিষ্টি স্বাদ এবং প্রাকৃতিক ঘ্রাণ—দুটিই আসে বন্য পরিবেশে জন্মানোর কারণে। হাইব্রিড কুলের চাষ লাভজনক হলেও বুনো কুলের প্রাকৃতিক স্বাদ তার নিজস্ব বাজার তৈরি করে নিয়েছে।

ক্রেতার অনুভব—"শীত বনকুল ছাড়া অসম্পূর্ণ"
উখড়ার বাসিন্দা সোমা দাসের কথায়, ‘‘এই কুলের স্বাদ কোনো হাইব্রিডের সঙ্গে তুলনাই হয় না। ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রহ করতে হয় বলে দাম বেশি—তা ঠিক, কিন্তু শীত মানেই বনকুল।’’ অন্যদিকে বিক্রেতা ঝর্না বাদ্যকর জানান, ‘‘ভোরবেলায় নদীর পাড় থেকে তুলতে যাই। হাতে কাঁটা ফুটে যায়। কিন্তু বাজারে এ কুলের চাহিদা এমন যে কষ্টের দাম পাই।

পূর্ব বর্ধমানের অজয়–দামোদর নদীর তীরে জন্মানো টকমিষ্টি বনকুল এই শীতে হয়ে উঠেছে বাজারের আকর্ষণ। স্বাদ ও ঘ্রাণে হাইব্রিড কুলকে পিছনে ফেলে দিয়েছে এই ছোট, কাঁটাঝোপে জন্মানো দেশি কুল। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সংগ্রহ করা এই ফল শীতে নুন–লঙ্কা–সরষের তেল মেখে খেলে স্বাদে হয় অতুলনীয়।













