ইংলিশ চ্যানেলে নৌকার ইঞ্জিনে আগুনের পর ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যৌথ অভিযানে ১৫৭ অভিবাসী উদ্ধার

ইংলিশ চ্যানেলে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রারত একটি অভিবাসীবাহী নৌকার ইঞ্জিনে আগুন লাগার পর ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্ধার অভিযানে ১৫৭ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর আহতের খবর পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার সকালে ইংলিশ চ্যানেলে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রারত অভিবাসীবোঝাই একটি ছোট নৌকার ইঞ্জিনে আগুন লাগার পর ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্ধারকারী দল মোট ১৫৭ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করেছে। ফরাসি সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনায় কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

ফরাসি সামুদ্রিক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অভিবাসীবোঝাই নৌকাটি সোমবার রাতে ফ্রান্সের উত্তর উপকূল থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যাত্রার প্রাথমিক পর্যায়ে সমুদ্র টহলদল নৌকাটিকে সহায়তার প্রস্তাব দিলেও অধিকাংশ যাত্রী যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আশায় সেই সহায়তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। তাৎক্ষণিক সহায়তার প্রয়োজন হওয়ায় কেবল কয়েকজন যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়, অন্যরা যাত্রা অব্যাহত রাখেন।

মঙ্গলবার সকালে নৌকার ইঞ্জিনে হঠাৎ আগুন লাগলে নৌকার কাঠামো দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মাঝসমুদ্রে নৌকাটি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ঘটনার খবর পাওয়ার পর ফ্রান্স ও যুক্তরাজয়ের সামুদ্রিক উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাত্রীদের নিরাপদ উদ্ধারকারী জাহাজে স্থানান্তর করে।

উদ্ধার অভিযানে ফ্রান্সের দুটি টহল নৌকা এবং যুক্তরাজ্যের একাধিক সামুদ্রিক ইউনিট অংশ নেয়। যুক্তরাজ্যের বর্ডার ফোর্স এবং রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন (RNLI)-এর লাইফবোটও ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১০৩ জনকে ফরাসি নৌযান এবং ৫৪ জনকে ব্রিটিশ উদ্ধারকারী জাহাজ উদ্ধার করে। পরে সকল অভিবাসীকে ফ্রান্সের বুলোঁ-সুর-মের বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের চিকিৎসা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়।

এ পর্যন্ত পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। সকল যাত্রীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে এবং চিকিৎসক দল তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্লান্তি ও ঠান্ডার কারণে কয়েকজন দুর্বল ছিলেন, তবে কারও অবস্থা গুরুতর নয়।

ইংলিশ চ্যানেল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক পথ। তা সত্ত্বেও প্রতি বছর হাজারো অভিবাসী ছোট ও অস্থায়ী নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এসব নৌকায় ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করা হয় এবং প্রতিকূল আবহাওয়া, উঁচু ঢেউ, যান্ত্রিক ত্রুটি ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে এ ধরনের যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানব পাচারকারীরা বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মানুষকে অনিরাপদ নৌকায় যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তাদের মতে, ইঞ্জিনে আগুন লাগার মতো ঘটনা এ ধরনের অভিযানের বড় দুর্বলতাগুলোকে সামনে আনে।

ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে যখন যুক্তরাজ্যে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, ছোট নৌকায় অবৈধভাবে প্রবেশ রোধে তার সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে।

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং ফ্রান্সের সঙ্গে সমন্বয়ে সামুদ্রিক নজরদারি শক্তিশালী করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন পথ উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইংলিশ চ্যানেলে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য একাধিক যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক নজরদারি বৃদ্ধি, ড্রোন ও হেলিকপ্টার মোতায়েন, সমুদ্র টহল এবং মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান।

দুই দেশের মতে, শুধু সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান যথেষ্ট নয়; মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে উৎসাহিত করা আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হাজারো মানুষ ইউরোপে পৌঁছানোর ঝুঁকি নিচ্ছেন। এর সুযোগ নিচ্ছে মানব পাচারকারীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ না হলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

 

Leave a comment