তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জন নিজেদের পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করে ত্রিপুরাভিত্তিক ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে একীভূত হওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিদ্রোহী সাংসদরা লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়ে পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন। তাদের দাবি, তারা দলের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সাংসদের সমর্থন পেয়েছেন এবং ভবিষ্যতে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-এর সঙ্গে কাজ করবেন।
বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, সাংসদদের এই গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে। তাঁর দাবি, দীর্ঘ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এখন এই গোষ্ঠী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে সমর্থন করবে।
তিনি আরও জানান, সংসদে পৃথক আসন বিন্যাসের দাবিও জানানো হয়েছে, যাতে নতুন রাজনৈতিক অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিফলিত হয়। এই দাবি মঞ্জুর হলে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যা ও প্রভাবের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলের নেতৃত্বের বক্তব্য, এই পদক্ষেপ জনাদেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল এবং তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিদ্রোহী নেতাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি বিশেষভাবে প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে বলেন, তিনি দল ও নেতৃত্বের আস্থা ভঙ্গ করেছেন। মহুয়া মৈত্রর মন্তব্যে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও ক্ষোভের ইঙ্গিত মিলেছে।
বিদ্রোহী সাংসদ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের মধ্যে বিরোধ এখন সংসদীয় প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্পিকারের কাছে পৃথক পরিচয় ও আসন বিন্যাসের দাবি জানিয়েছে, অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্ব স্পিকারকে চিঠি দিয়ে ওই গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুরোধ করেছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে লোকসভার স্পিকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে, কারণ তাঁর সিদ্ধান্ত সংসদীয় অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে। তবে চূড়ান্ত আইনি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরই সামনে আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিদ্রোহী সাংসদদের অন্য একটি রাজনৈতিক দলে একীভূত হওয়ার দাবি দলত্যাগবিরোধী আইনের বিধান এড়ানোর কৌশলের অংশ হতে পারে। ভারতীয় সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী, কোনো দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ অন্য একটি রাজনৈতিক দলে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তারা অযোগ্যতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন।

বিদ্রোহী নেতাদের দাবি, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সংখ্যা রয়েছে এবং সেই কারণে তাদের পদক্ষেপ সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে এই দাবির বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদীয় ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পরই নির্ধারিত হবে।
রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উভয় পক্ষই নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিদ্রোহী নেতাদের দাবি, তাদের কাছে দলের অধিকাংশ সাংসদের সমর্থন রয়েছে। সেই কারণে ভবিষ্যতে তারা দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীকের ওপরও দাবি জানাতে পারেন।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সমর্থকেরা এই দাবি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশন এবং আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
যে দলে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদদের একীভূত হওয়ার দাবি করা হয়েছে, সেই ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই) ত্রিপুরার একটি নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল। এতদিন পর্যন্ত দলটির প্রভাব সীমিত ছিল এবং জাতীয় রাজনীতিতে তার উপস্থিতি প্রায় অজানা ছিল।
দলটি ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, কিন্তু উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। নির্বাচনী ফলও দুর্বল ছিল এবং রাজ্য পর্যায়েও দলটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
এই কারণেই জাতীয় স্তরের সাংসদদের এই দলে একীভূত হওয়ার দাবি রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
এনসিপিআই-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন স্থানীয় নেতাও এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনের মতে, দলের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এই বড় রাজনৈতিক ঘটনার বিষয়ে আগে থেকে অবগত ছিলেন না।
এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, আগামী দিনে এনসিপিআই-এর সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। যদি বিপুল সংখ্যক সাংসদ বাস্তবেই এই দলের অংশ হন, তবে দলটি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেসে সম্ভাব্য বিভাজনের প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকবে না। লোকসভায় বিরোধী রাজনীতির কৌশল, ইন্ডিয়া জোটের শক্তি এবং এনডিএ-র সংখ্যাগত অবস্থানেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
যদি বিদ্রোহী সাংসদরা এনডিএ-কে সমর্থন অব্যাহত রাখেন, তবে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদীয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সমর্থন পেতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দল ও শাসক দলের রাজনৈতিক সমীকরণেও পরিবর্তন আসতে পারে।










