তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বলিউডে পা রাখেননি ঐশ্বর্য রাই বচ্চন। বরং পড়াশোনা শেষ করে স্থাপত্যবিদ্যার জগতে নিজের কেরিয়ার গড়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যায় অন্য পথে। মডেলিংয়ের সুযোগ, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় সাফল্য এবং ১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুট—একটার পর একটা ঘটনা বদলে দেয় তাঁর জীবন। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক কীভাবে এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন ঐশ্বর্য।
ম্যাঙ্গালোরে জন্ম, মুম্বইয়ে বড় হয়ে ওঠা
১৯৭৩ সালের ১ নভেম্বর কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালোরে জন্মগ্রহণ করেন ঐশ্বর্য রাই। তাঁর বাবা কৃষ্ণরাজ রাই ছিলেন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এবং মা বৃন্দা রাই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বড় ভাই আদিত্য রাই মার্চেন্ট নেভিতে কর্মরত ছিলেন।পরবর্তীকালে পরিবারের সঙ্গে মুম্বইয়ে চলে আসেন ঐশ্বর্য। সেখানেই পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি নানা বিষয়ে আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রের নায়িকা হওয়ার পরিকল্পনা ছিল না।
অভিনয় নয়, স্বপ্ন ছিল স্থপতি হওয়ার
ঐশ্বর্য রাইয়ের জীবনের একটি কম পরিচিত দিক হল, তিনি স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল আর্কিটেকচার নিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে সেই পেশাতেই নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করা।কলেজে পড়ার সময়ই মডেলিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে বিজ্ঞাপনে কাজ করার সুযোগ আসতে শুরু করে। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি মডেলিংয়ের জগতেও পরিচিতি বাড়তে থাকে তাঁর।
আমির খানের সঙ্গে বিজ্ঞাপন, নজরে আসেন ঐশ্বর্য
মডেলিং কেরিয়ারের শুরুতেই বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনে কাজ করেন ঐশ্বর্য। আমির খান ও মহিমা চৌধুরীর সঙ্গে একটি কোল্ড ড্রিংকের বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল তাঁকে।সেই বিজ্ঞাপনে তাঁর বলা ‘হাই, আমি সঞ্জনা’ সংলাপটি দর্শকদের মনে বিশেষভাবে জায়গা করে নেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব নজর কাড়ে বিজ্ঞাপন ও মডেলিং জগতের।
মিস ইন্ডিয়ায় সুস্মিতার কাছে হার, তারপর বিশ্বজয়
১৯৯৪ সাল ঐশ্বর্য রাইয়ের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বছর। ওই বছর মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন সুস্মিতা সেন। ঐশ্বর্য পান প্রথম রানার-আপের খেতাব।এরপর ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। সেখানেই জিতে নেন বিশ্বসুন্দরীর মুকুট। এই সাফল্যের পর রাতারাতি আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি হয় তাঁর।তখনও তিনি স্থাপত্যবিদ্যার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মিস ওয়ার্ল্ড হওয়ার পর তাঁর সামনে খুলে যায় মডেলিং ও বিনোদন জগতের নতুন সম্ভাবনা।
পড়াশোনা শেষ করবেন, নাকি সিনেমায় আসবেন?
মিস ওয়ার্ল্ড হওয়ার পর ঐশ্বর্যের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল—পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন, নাকি নতুন সুযোগের হাত ধরে এগিয়ে যাবেন?এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, বিশ্বসুন্দরী হওয়ার পরও তাঁর মনে পড়াশোনা শেষ করার ইচ্ছা ছিল। নিজের ব্যাচের সঙ্গে ডিগ্রি সম্পূর্ণ করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও ভাবতেন তিনি।কিন্তু একের পর এক কাজের সুযোগ আসতে থাকায় শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র জগতের দিকেই এগিয়ে যান ঐশ্বর্য। স্থপতি হওয়ার স্বপ্ন পিছনে রেখে শুরু হয় তাঁর অভিনয়জীবন।
‘ইরুভার’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক, ‘জিন্স’ এনে দেয় পরিচিতি
১৯৯৭ সালে পরিচালক মণি রত্নমের তামিল ছবি ‘ইরুভার’-এর মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন ঐশ্বর্য। একই বছরে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ‘অউর পেয়ার হো গয়া’। এই ছবিতে ববি দেওলের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তিনি।প্রথমদিকে প্রত্যাশামতো সাফল্য না এলেও ১৯৯৮ সালের তামিল ছবি ‘জিন্স’ তাঁকে দক্ষিণ ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে পরিচিত করে তোলে। ধীরে ধীরে বলিউডেও নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেন তিনি।
‘হাম দিল দে চুকে সনম’ থেকে ‘দেবদাস’, সাফল্যের নতুন অধ্যায়
১৯৯৯ সালে সঞ্জয় লীলা বনশালির ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ ঐশ্বর্যের কেরিয়ারে বড় সাফল্য এনে দেয়। ছবিতে নন্দিনী চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পায়। এই ছবির জন্য ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান তিনি।এরপর ২০০২ সালে মুক্তি পায় ‘দেবদাস’। শাহরুখ খান ও মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে এই ছবিতে পারোর চরিত্রে অভিনয় করে আরও একবার নজর কাড়েন ঐশ্বর্য। এই ছবির জন্যও ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান পান তিনি।পরবর্তী সময়ে ‘ধুম ২’, ‘গুরু’, ‘যোধা আকবর’, ‘সরকার রাজ’, ‘গুজারিশ’ এবং ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের অভিনয়জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।
অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে বিয়ে, মা হলেন আরাধ্যার
ব্যক্তিগত জীবনেও নতুন অধ্যায় শুরু হয় ঐশ্বর্যের। ২০০৭ সালের ২০ এপ্রিল অভিনেতা অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। শুটিংয়ের সূত্রে দু’জনের পরিচয়, পরে বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।২০১১ সালের নভেম্বর মাসে তাঁদের কন্যা আরাধ্যার জন্ম হয়। বিয়ে ও মাতৃত্বের পরেও অভিনয়জগতের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন ঐশ্বর্য। কাজ ও পরিবারের দায়িত্ব সামলে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি ধরে রেখেছেন তিনি।
বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঐশ্বর্য রাই বচ্চনের জন্মদিন ১ নভেম্বর। সৌন্দর্য, অভিনয় দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির কারণে তিনি আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু জানেন কি, অভিনয় জগতে আসার আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল স্থপতি হওয়ার? আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করার সময়ই মডেলিংয়ে পা রাখেন তিনি। ১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জয়ের পর বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। বিজ্ঞাপন থেকে সিনেমা, তারপর বলিউডের অন্যতম সফল অভিনেত্রী হয়ে ওঠার গল্প বেশ চমকপ্রদ।





