অনীক দত্তের অজানা মুখ: বাড়িতে ছিলেন ‘বুবা’, কোটি টাকার প্রলোভনও টলাতে পারেনি সততার প্রতীক এই পরিচালক

পরিচালক অনীক দত্তের মৃত্যুর পর সামনে এল তাঁর জীবনের অজানা অধ্যায়। পরিবারের কাছে ‘বুবা’ নামে পরিচিত এই নির্মাতা বাড়তি ৩৫ লক্ষ টাকা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সততার কারণে। পড়ুন বিস্তারিত।

বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক অনীক দত্তের মৃত্যু যেন এখনও মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অনুরাগী ও সহকর্মীরা। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর মতো কালজয়ী ছবি উপহার দেওয়া এই নির্মাতার চলে যাওয়ার পর শুধু তাঁর চলচ্চিত্র নয়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। বিশেষ করে অবসাদ, শারীরিক অসুস্থতা এবং জীবনের নানা অজানা অধ্যায় এখন নতুন করে সামনে আসছে।

‘বুবা’ নামেই পরিচিত ছিলেন পরিবারের অন্দরে

চলচ্চিত্র জগতের অনীক দত্তকে সবাই চিনতেন তাঁর তীক্ষ্ণ বক্তব্য ও স্পষ্ট মতামতের জন্য। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি ছিলেন একেবারে অন্যরকম। ভালবেসে বাড়ির সকলে তাঁকে ডাকতেন ‘বুবা’ নামে। আত্মীয়দের মতে, খ্যাতি ও সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও তিনি কখনও পারিবারিক সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাননি। ঘরোয়া আড্ডা, আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সাধারণ জীবনযাপনই ছিল তাঁর পছন্দের বিষয়।

বনেদি পরিবারের সন্তান, তবু ছিল না সম্পত্তির প্রতি লোভ

অনীক দত্ত এমন এক পরিবারের সন্তান, যেখানে অর্থ ও শিক্ষার ঐতিহ্য বহু প্রজন্ম ধরে বহমান। তিনি ছিলেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্রচন্দ্র দত্তের নাতি। শৈশব থেকেই আর্থিক স্বচ্ছলতার মধ্যে বেড়ে উঠলেও সম্পদের প্রতি কোনও বিশেষ আকর্ষণ ছিল না তাঁর।পরিবারের ঘনিষ্ঠদের দাবি, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর জীবনের কঠিন সময়ও দেখেছেন অনীক। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে কখনও অর্থলোভী করে তোলেনি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন সৃজনশীলতাই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

বিজ্ঞাপনের জগৎ থেকে সিনেমায়, তারপর সাফল্যের শিখরে

পেশাগত জীবনের শুরু বিজ্ঞাপনের জগতে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসেন তিনি। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মুক্তির পর রাতারাতি জনপ্রিয়তার কেন্দ্রে চলে আসেন অনীক দত্ত। এরপর একের পর এক ছবি পরিচালনা করে তিনি বাংলা সিনেমায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন।শুধু পরিচালক হিসেবেই নয়, লেখক, প্রাবন্ধিক, কার্টুনিস্ট এবং ইলাস্ট্রেটর হিসেবেও তাঁর প্রতিভার পরিচয় মিলেছে। সৃজনশীলতার এই বহুমাত্রিক দিকই তাঁকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

প্রযোজকের বাড়তি টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার বিরল নজির

অনীক দত্তের সততার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির মধ্যে একটি সামনে এনেছেন তাঁর আত্মীয় জয় রায়। তাঁর কথায়, একটি ছবির জন্য অনীক যে বাজেট চেয়েছিলেন, তা ছিল ৪ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু প্রযোজক তাঁকে ৫ কোটি টাকা দিতে রাজি হন।সাধারণত চলচ্চিত্র জগতে বেশি বাজেট পাওয়াকে অনেকেই সাফল্য হিসেবে দেখেন। কিন্তু অনীক দত্তের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। তিনি বাড়তি ৩৫ লক্ষ টাকা নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ছবি তৈরির জন্য যত টাকা প্রয়োজন, তার বেশি নেওয়ার কোনও নৈতিক অধিকার তাঁর নেই।এই ঘটনা শুনে উপস্থিত সকলেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ বর্তমান সময়ে এমন উদাহরণ খুব কমই দেখা যায়।

খ্যাতির আড়ালে এক বিরল মানবিক চরিত্র

অনীক দত্তের মেয়ে ঐশীর কথাতেও উঠে এসেছে তাঁর বাবার সততার পরিচয়। কোনও ছবির কাজ শেষ হওয়ার পর যদি বাজেটের কিছু অর্থ বেঁচে যেত, তাহলে সেটিও প্রযোজককে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। অর্থ নয়, কাজের গুণমান এবং সৃজনশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন এই পরিচালক।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খ্যাতি, সম্মান এবং জনপ্রিয়তা তাঁর জীবনে এসেছে। কিন্তু ব্যক্তিত্বের মূল সুর কখনও বদলায়নি। সেই কারণেই সহকর্মী থেকে আত্মীয়—সকলের কাছেই তিনি ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।

বাংলা চলচ্চিত্র জগত এখনও শোকাহত পরিচালক অনীক দত্তের আকস্মিক প্রয়াণে। পর্দার সামনে স্পষ্টবাদী ও রগচটা ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হলেও পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন একেবারেই অন্য মানুষ। আত্মীয়দের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে এমন সব ঘটনা, যা তাঁর সততা, সরলতা এবং অর্থের প্রতি অনাসক্তির বিরল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।

Leave a comment