বসন্ত মানেই রঙের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই রঙ যদি হয় প্রকৃতির দান? আসানসোল মহকুমার হাড়মাড়ডি রাঙাপাড়া আদিবাসী গ্রামে দোল উৎসব পালন হয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে। শালফুলের রেণু, পবিত্র জল আর ধামসা-মাদলের সুরে এখানে বসন্ত আসে এক অনন্য ঐতিহ্যের বার্তা নিয়ে।
আবিরের বদলে জঙ্গলের শালফুল, প্রকৃতিতেই রঙের সন্ধান
দেশের অধিকাংশ জায়গায় দোল মানেই বাজারি রং ও কেমিক্যাল আবির। কিন্তু হাড়মাড়ডি রাঙাপাড়ায় সেই ছবিটা একেবারেই আলাদা। গ্রামের পুরুষেরা গভীর জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনেন শালফুলের রেণু। সেই রেণু দিয়েই শুরু হয় উৎসবের প্রস্তুতি। প্রথমে ইষ্টদেবতার পুজোয় নিবেদন করা হয় ফুল, তারপর সেই পবিত্র রেণু জলে ভিজিয়ে রাখা হয় বিশেষ আচার মেনে।
দোলের সঙ্গে সমান্তরালে ‘বাহা উৎসব’, ঐতিহ্যের বন্ধন অটুট
এই গ্রামে দোল উৎসবের পাশাপাশি পালিত হয় আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ‘বাহা উৎসব’। বসন্তকে বরণ করার এই উৎসব শুধু রঙের খেলা নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। ফুল, মাটি ও জলের মিলনে তৈরি হয় এক গভীর সাংস্কৃতিক আবহ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলেছেন গ্রামের মানুষ।
ধামসা-মাদলের তালে মেতে ওঠে গ্রাম, ‘বাহা বাস্কি’ জলেই আনন্দ
উৎসবের শেষ দিনে ধামসা ও মাদলের তালে শুরু হয় আদিবাসী নৃত্য। গ্রামের বাসিন্দা মতিলাল সরেন জানান, দোলের আগের দিন পুরোহিত বাড়ি বাড়ি ফুল বিলিয়ে দেন। পরদিন সেই ফুল ‘বাহা বাস্কি’ নামে পরিচিত হয়। সেই ফুল জলে ভিজিয়ে তৈরি করা পবিত্র জল দিয়েই চলে জলখেলা, নাচ-গান ও সারাদিনের প্রীতিভোজ। এখানে রং মানে কৃত্রিম কেমিক্যাল নয়, বরং বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধন।
আধুনিকতার ভিড়ে প্রকৃতির পাঠ
আজকের যুগে যখন উৎসব মানেই চড়া রঙ আর বাজারি আয়োজন, তখন হাড়মাড়ডি রাঙাপাড়া যেন অন্য বার্তা দেয়। প্রকৃত আনন্দ লুকিয়ে আছে গাছের ফুলে, মাটির গন্ধে আর শেকড়ের ঐতিহ্যে। এই গ্রাম মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সঙ্গে মিলেই উৎসবের আসল রং খুঁজে পাওয়া যায়।
দেশজুড়ে যখন আবির আর কৃত্রিম রঙে দোল উৎসবের জোয়ার, তখন পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলের হাড়মাড়ডি রাঙাপাড়া আদিবাসী গ্রাম দেখাল এক ভিন্ন ছবি। এখানে দোল মানে রাসায়নিক রং নয়, বরং জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা শালফুলের রেণু আর পবিত্র জল। ঐতিহ্যবাহী ‘বাহা উৎসব’-এর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয় রঙের আনন্দ, ধামসা-মাদলের তালে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম।








