Bahurupi Culture: একসময় পাড়ায় পাড়ায় ডাক পড়ত, এখন ‘চোর’ সন্দেহে অপমান! হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার বহুরূপী শিল্প

ডিজিটাল যুগে বিলুপ্তির মুখে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বহুরূপী শিল্প। কমেছে উপার্জন, বেড়েছে অবহেলা ও ‘চোর’ সন্দেহের অভিযোগ। জানুন বহুরূপীদের বর্তমান সংকট।

একটা ঝোলা কাঁধে, মুখে রং, শরীরে অদ্ভুত পোশাক। কখনও ভয়ংকর ডাকাত, কখনও দেবদেবী, আবার কখনও কোনও পশুর অবয়ব। দুপুরবেলা হঠাৎ গ্রামের রাস্তায় এমন কাউকে দেখলেই ছোটরা ছুটত মায়ের আঁচলের আড়ালে। কারও মুখে ভয়, কারও চোখে বিস্ময়—বহুরূপী শিল্পীদের ঘিরে এমন স্মৃতি বাংলার বহু প্রজন্মের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল। প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বহুরূপী শিল্প।

বহুরূপী কারা?

বহুরূপীরা মূলত লোকশিল্পী। নানা ধরনের সাজ, মেকআপ, পোশাক এবং অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁরা একের পর এক চরিত্র ধারণ করতেন। কখনও দেবদেবী, কখনও ডাকাত, কখনও পশু-পাখি বা কাল্পনিক কোনও চরিত্র সেজে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের বিনোদন করতেন।অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের সঙ্গে থাকত একটি ঝোলা। দর্শকরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেখানে চাল, সবজি কিংবা টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন। সেই সামান্য উপার্জনেই চলত শিল্পীদের সংসার।

ছোটবেলার সেই ভয়ংকর দুপুরগুলো কোথায় গেল?

একসময় গ্রামবাংলায় বহুরূপীদের দেখা পাওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। দুপুরের দিকে হঠাৎ শোনা যেত ভয়ংকর হাসি কিংবা নাটকীয় সংলাপ। ডাকাতের সাজে কেউ নিজেকে পরিচয় দিত, আবার কোনও ভয়ঙ্কর চরিত্রের অভিনয়ে শিশুদের চমকে দিত।বাচ্চাদের কেউ ভয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ত, কেউ মায়ের আঁচলের নিচে লুকিয়ে পড়ত। আবার কারও চোখে থাকত কৌতূহল। ভয় আর আনন্দ মিলিয়ে বহুরূপীদের ঘিরে তৈরি হত এক অন্যরকম পরিবেশ।মিলেনিয়াল প্রজন্মের অনেকের কাছেই এই স্মৃতি আজ নস্টালজিয়ার অংশ।

সাহিত্যেও জায়গা করে নিয়েছিল এই শিল্প

বহুরূপী শুধু গ্রামবাংলার বিনোদনের অংশ ছিল না, বাংলা সাহিত্যেও এই লোকশিল্পের ছাপ রয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ছিনাথ বহুরূপী’ চরিত্রের মাধ্যমে বাংলার সাহিত্যেও বহুরূপী শিল্পীদের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।বহুরূপীদের জীবন ও তাঁদের সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বাংলা সিনেমাতেও কাজ হয়েছে। অর্থাৎ এই শিল্প একসময় বাংলার সংস্কৃতি ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

ডিজিটাল যুগে কেন কমে গেল বহুরূপীদের সংখ্যা?

সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের বিনোদনের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।ফলে আগের মতো বাড়ি বাড়ি বা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বহুরূপীদের অভিনয় দেখার প্রবণতা কমেছে। দর্শক কমেছে, স্বাভাবিকভাবেই কমেছে উপার্জনও।অনেক শিল্পী তাই জীবিকার প্রয়োজনে অন্য পেশার দিকে চলে যাচ্ছেন।

এখনও কী বহুরূপীরা সাজেন?

সম্পূর্ণভাবে এই শিল্প হারিয়ে যায়নি। কোথাও কোথাও এখনও বহুরূপীদের দেখা যায়। তবে আগের মতো দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন চরিত্রে সেজে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর চল অনেকটাই কমেছে।কোনও কোনও শিল্পী বিশেষ দিনে নির্দিষ্ট একটি সাজে হাজির হন। হনুমান, কালী বা শিবের মতো চরিত্রের সাজ এখনও তুলনামূলকভাবে দেখা যায়। কিন্তু আগের মতো বৈচিত্র্যময় চরিত্র ও দীর্ঘ অভিনয়ের পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।

‘চোর’ সন্দেহে অপমানের অভিযোগ!

বহুরূপী শিল্পী সুনীল বৈরাগ্যের কথায় উঠে এসেছে আরও একটি উদ্বেগজনক দিক। তাঁর দাবি, এখন কোথাও কোথাও সাজগোজ করে গ্রামে গেলে তাঁদের চোর বলে সন্দেহ করা হয়।তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সব জায়গায় এমন অভিজ্ঞতা হয় না। বহু গ্রামেই এখনও তাঁরা সম্মান পান এবং ভালোভাবেই ফিরে আসেন।তবুও এই ধরনের সন্দেহ ও অপমান শিল্পীদের জন্য বড় মানসিক ধাক্কা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন প্রজন্ম কেন এই পেশায় আসতে চাইছে না?

মূল সমস্যা অর্থনীতি। আগের তুলনায় বহুরূপীদের আয় অনেকটাই কমে গিয়েছে। মানুষের আগ্রহ কমায় তাঁদের নিয়মিত উপার্জনের নিশ্চয়তাও নেই।সুনীল বৈরাগ্যের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কারণেই তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে শিল্পটি টিকিয়ে রাখার মতো নতুন শিল্পীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে।

শুধু বিনোদন নয়, এটি বাংলার লোকঐতিহ্য

বহুরূপী শিল্পকে শুধু পুরনো দিনের বিনোদন হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে ছোট করা হয়। সাজসজ্জা, অভিনয়, লোকভাষা, তাৎক্ষণিক সংলাপ এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—সব মিলিয়ে এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র ধারা।এই শিল্প হারিয়ে গেলে শুধু একটি পেশা নয়, হারিয়ে যাবে বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতিও।

একসময় বাংলার গ্রামেগঞ্জে বহুরূপীদের উপস্থিতিই ছিল ছোটদের কাছে রোমাঞ্চ ও আতঙ্কের অন্যতম আকর্ষণ। কখনও কালী, কখনও দুর্গা, আবার কখনও ডাকাত বা পশুর সাজে মানুষের মনোরঞ্জন করতেন তাঁরা। বিনিময়ে মিলত চাল, সবজি কিংবা সামান্য অর্থ। কিন্তু ডিজিটাল বিনোদনের যুগে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এই লোকশিল্প। উপার্জন কমেছে, বেড়েছে সামাজিক অবহেলা। এমনকি কোথাও কোথাও বহুরূপী শিল্পীদের চোর ভেবে সন্দেহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। ফলে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

Leave a comment