বাঙালির মিষ্টির কথা উঠলে রসগোল্লা, সন্দেশের সঙ্গে অবধারিতভাবেই আসে দইয়ের নাম। মাটির ভাঁড়ে পাতা টক দই কিংবা গাঢ় লাল মিষ্টি দই—এই দুই রূপই সবচেয়ে পরিচিত। কিন্তু বাংলার দইয়ের জগৎ যে তার থেকেও অনেক বড়, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। কোথাও বাঁশের ঝুড়িতে দই পাতা হয়, কোথাও আবার দইয়ের উপর থাকে ঘন ক্ষীরের আস্তরণ। আবার ভাপে তৈরি হয় পুডিংয়ের মতো দই। চলুন দেখে নেওয়া যাক বাংলার এমনই কয়েকটি বৈচিত্র্যময় দই।
লাল মিষ্টি দই
বাংলার মিষ্টির দোকানের অন্যতম পরিচিত নাম লাল মিষ্টি দই। দুধকে ধীরে ধীরে জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয় এবং দীর্ঘক্ষণ রান্নার ফলে দুধের রং হালকা বাদামি বা ক্যারামেল-রঙা হয়ে ওঠে।এরপর সেই দুধে মিষ্টি স্বাদ এনে দই বসানো হয়। ঘন, মোলায়েম এবং গভীর মিষ্টি স্বাদের জন্য উৎসব বা বিশেষ অনুষ্ঠানে এই দইয়ের চাহিদা বরাবরই বেশি।
সাদা মিষ্টি দই
লাল মিষ্টি দইয়ের পাশাপাশি রয়েছে সাদা মিষ্টি দই। এতে দুধের রং ক্যারামেলাইজ করে গাঢ় করা হয় না। ফলে দইয়ের স্বাভাবিক সাদা রং বজায় থাকে।দুধ ও চিনির মৃদু মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে ক্রিমি টেক্সচার এই দইয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কলকাতার বেশ কিছু মিষ্টির দোকানেও এই ধরনের দই পাওয়া যায়।
ক্ষীর দই
দইয়ের উপর যদি যোগ হয় ঘন ক্ষীর বা সরের আস্তরণ, তাহলে তৈরি হয় আরও সমৃদ্ধ স্বাদের মিষ্টান্ন—ক্ষীর দই।নিচে থাকে ঘন মিষ্টি দই, তার উপর পুরু ক্ষীরের স্তর। দইয়ের টক-মিষ্টি স্বাদের সঙ্গে ক্ষীরের ঘনত্ব মিলে এই মিষ্টান্নকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। বিশেষ অনুষ্ঠান বা উৎসবের মেনুতেও এমন দই জায়গা করে নেয়।
ঝুরি পাতা দই
বাংলার দইয়ের বৈচিত্র্যের অন্যতম আকর্ষণ হল ঝুরি পাতা দই, যা ঝুড়ির দই নামেও পরিচিত। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী দইয়ের নাম জড়িয়ে রয়েছে।সাধারণ মাটির ভাঁড়ের বদলে বাঁশ বা বেতের ছোট ঝুড়িতে কাপড় পেতে তার মধ্যে দই বসানো হয়। দই তৈরির এই অভিনব পদ্ধতিই তাকে অন্য ধরনের দই থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
অমৃত পয়োধি
নামেই যার মধ্যে রয়েছে বিশেষত্ব—অমৃত পয়োধি। ক্ষীর ও দইয়ের সমন্বয়ে তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী পদটির নামের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গও জড়িত বলে প্রচলিত রয়েছে।‘অমৃত’ অর্থ সুধা এবং ‘পয়োধি’ শব্দের অর্থ দুধ বা ক্ষীরের সমুদ্র। নামের মতোই এর স্বাদে রয়েছে দুধ, ক্ষীর ও দইয়ের ঘন মেলবন্ধন।
ভাপা দই
দই দিয়ে তৈরি মিষ্টির তালিকায় ভাপা দইয়ের অবস্থানও বেশ আলাদা। জল ঝরানো ঘন দই দিয়ে তৈরি এই মিষ্টান্নকে ভাপে রান্না করা হয়।ফলে এর টেক্সচার অনেকটা নরম পুডিং বা চিজকেকের মতো হয়। অনেক সময় উপরে জাফরান, বাদাম বা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সাজানো হয়। ঠান্ডা করে পরিবেশন করলে এর স্বাদ আরও ভালো লাগে।
আম দই
দইয়ের সঙ্গে যদি মিশে যায় পাকা আমের স্বাদ, তখন তৈরি হয় আম দই। ঘন মিষ্টি দইয়ের সঙ্গে আমের পাল্প মিশিয়ে এই ফলের স্বাদের মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়।মিষ্টি দইয়ের ক্রিমি স্বাদ আর আমের মিষ্টি-সুগন্ধি স্বাদের সংমিশ্রণ এটিকে আলাদা মাত্রা দেয়। আধুনিক সময়ে আমের পাশাপাশি অন্যান্য ফলের স্বাদ দিয়েও বিভিন্ন ধরনের ফ্লেভারড দই তৈরি হচ্ছে।
বাংলার দইয়ের বৈচিত্র্য কোথায়?
একই দুধ থেকে তৈরি হলেও দইয়ের স্বাদ ও গঠন বদলে যায় তৈরির পদ্ধতি, দুধ কতটা জ্বাল দেওয়া হচ্ছে, মিষ্টির পরিমাণ এবং কীভাবে দই বসানো হচ্ছে তার উপর। কোথাও মাটির ভাঁড়ের ব্যবহার, কোথাও ঝুড়ি, কোথাও আবার ক্ষীর বা ফলের সংযোজন—এই বৈচিত্র্যই বাংলার মিষ্টি সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলার মিষ্টির জগতে দইয়ের জনপ্রিয়তা বহু পুরনো। লাল মিষ্টি দই বা সাদা টক দইয়ের পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয় নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী ও স্বাদের দই। ক্ষীর দই, ঝুরি পাতা দই, ভাপা দই থেকে আম দই—প্রতিটির রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।













