জগন্নাথ নন, রথে ওঠেন রাজপরিবারের কুলদেবতা! বর্ধমান রাজবাড়ির ৩০০ বছরের ঐতিহ্য আজও অটুট

পূর্ব বর্ধমানের রাজপরিবারের ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রায় জগন্নাথের বদলে রাজার রথে গোপাল এবং রানীর রথে লক্ষ্মীনারায়ণ আরোহন করেন। জানুন এই বিরল ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বিশেষত্ব।

বাংলার অধিকাংশ রথযাত্রায় যেখানে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাই প্রধান আকর্ষণ, সেখানে বর্ধমান রাজপরিবারের রথযাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ঐতিহ্যের সাক্ষী। এখানে রাজার রথে বিরাজ করেন কুলদেবতা গোপাল, আর রানীর রথে আরোহন করেন লক্ষ্মীনারায়ণ। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে চলে আসা এই ব্যতিক্রমী রীতি এখনও বর্ধমানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহাসিক রথযাত্রা

বর্ধমান শহরের সোনাপট্টি এলাকার লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে অনুষ্ঠিত এই রথযাত্রার সূচনা হয় মহারাজা মহতাব চাঁদের আমলে। দীর্ঘ তিন শতাব্দী ধরে একই প্রথা মেনে উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে।রথযাত্রার দিন সকাল থেকেই বিশেষ পূজা, ধর্মীয় আচার এবং মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের ভিড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।

দুটি রথ, দুটি ঐতিহ্য

এই রথযাত্রায় রয়েছে দুটি পৃথক রথ—

রাজার রথ

রানীর রথ

একসময় রানীর রথটি ছিল রূপোর তৈরি। সময়ের সঙ্গে সেটি কাঠের রথে রূপান্তরিত হয়েছে। অন্যদিকে রাজার রথ এখনও পিতলের তৈরি, যা আজও রাজপরিবারের ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

জগন্নাথ নন, রথে ওঠেন কুলদেবতা

এই রথযাত্রার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এখানে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ রথে আরোহন করেন না।

প্রথা অনুযায়ী—

রাজার রথে বিরাজ করেন কুলদেবতা গোপাল।

রানীর রথে থাকেন লক্ষ্মীনারায়ণ।

এই অনন্য রীতিই বর্ধমান রাজপরিবারের রথযাত্রাকে বাংলার অন্যান্য রথ উৎসব থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

একসময় ছিল রাজকীয় জৌলুস

অতীতে এই রথযাত্রাকে ঘিরে রাজবাড়ি ও মন্দির চত্বরে উৎসবের বিশেষ আয়োজন থাকত।

তখন অনুষ্ঠিত হত—

যাত্রাপালা,

রামায়ণ পাঠ,

ঝাড়বাতির আলোয় আলোকসজ্জা,

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই উৎসব ছিল ঐতিহ্য, আড়ম্বর এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের অনন্য মিলনস্থল।

রাজত্ব নেই, কিন্তু ঐতিহ্য বেঁচে আছে

ভারতে রাজতন্ত্রের অবসানের পর আগের সেই জৌলুস অনেকটাই কমে গেলেও রথযাত্রার মূল প্রথায় কোনও পরিবর্তন আসেনি।মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় মানুষ আজও নিষ্ঠার সঙ্গে শতাব্দীপ্রাচীন এই রীতিকে ধরে রেখেছেন। প্রতিবছর অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক রথযাত্রার সাক্ষী হতে মন্দিরে ভিড় জমান।

পুরোহিত কী জানালেন?

মন্দিরের পুরোহিত উত্তম মিশ্রের কথায়, এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বর্ধমান রাজপরিবারের দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রায় ৩০০ বছর ধরে একই নিয়মে পূজা ও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রাজত্ব না থাকলেও মানুষের অংশগ্রহণই এই ঐতিহ্যকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে।

পূর্ব বর্ধমানের সোনাপট্টির লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে এ বছরও ধুমধাম করে পালিত হল বর্ধমান রাজপরিবারের প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা। এই রথযাত্রার বিশেষত্ব হল, এখানে জগন্নাথদেবের পরিবর্তে রাজপরিবারের কুলদেবতা গোপাল ও লক্ষ্মীনারায়ণ রথে আরোহন করেন। রাজত্বের অবসান হলেও শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রথা আজও সমান নিষ্ঠায় পালন করা হচ্ছে।

Leave a comment