ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান শুক্রবার বলেছেন, তাঁর দেশ কোনো ধরনের “দাদাগিরি” ও “অহংকারের” সামনে মাথা নত করবে না। তিনি বলেন, ইরান তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করবে। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ার মধ্যেই তাঁর এই বক্তব্য এসেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। সম্মেলনের মঞ্চ থেকে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে দেশের অবস্থান স্পষ্ট করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ইরান কোনো চাপ বা “দাদাগিরির” সামনে মাথা নত করবে না।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করবে। দুই দেশের মধ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তাঁর এই বক্তব্য এসেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর আরও গভীর হয়েছে। দুই পক্ষের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে কঠোর বক্তব্য সামনে আসছে এবং আঞ্চলিক স্তরেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছ থেকেও ইরান নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রুবিও বুধবার বলেন, ভারত ও ইরানের মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে তিনি মনে করেন না।
রুবিও অন্য দেশগুলিকেও ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা না করার জন্য সতর্ক করেন। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসছে এবং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে অন্যান্য দেশের কার্যকলাপের ওপরও নজর রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের মধ্যে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা মতপার্থক্যকে সামনে এনেছে। ইরানের বক্তব্য, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম অধিকার থেকে পিছিয়ে যাবে না।
মার্কিন হামলার পর ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে এবং আটটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস করেছে। তবে এই ধরনের সামরিক দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, এসব ঘটনা দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। তেলবাহী ট্যাঙ্কার-সংক্রান্ত ঘটনাগুলি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পশ্চিম এশিয়ার সমুদ্রপথ ও জ্বালানি সরবরাহ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগে মার্কিন সেনাবাহিনী পাঁচটি ইরানি ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছিল বলে জানা গিয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় কয়েক মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত তেল পুড়ে যায়। সমুদ্রাঞ্চলে জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনায় জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বক্তব্য দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরেই শেষ হবে।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইরান লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং বর্তমানে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা করছে। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়সীমা নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এবং এটিকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য বা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখা যায় না।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রেট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালী নিয়েও ট্রাম্প দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এখন এই জলপথের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বিশ্বের তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই অঞ্চল দিয়ে যায়। ফলে এখানে কোনো সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু পশ্চিম এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ট্রাম্প ইরানি শাসনব্যবস্থাকে “পাগল” বলে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস না করলে ইরান এতদিনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলত। তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে আটকাতে তিনি বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করেছিলেন।
ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে আটকানো যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। এই বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করেছে। বর্তমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্য এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা গুরুতর অবস্থায় রয়েছে। একদিকে ইরান তার জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পিছিয়ে না যাওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে।
জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কার-সংক্রান্ত ঘটনাগুলির দাবি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। সমুদ্রপথে উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব জ্বালানি সরবরাহ, অপরিশোধিত তেলের দাম এবং বৈশ্বিক বাজারে পড়তে পারে।
বর্তমানে দুই পক্ষের বক্তব্যেই কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সামনে মাথা নত না করার বার্তা দিয়েছে, আর ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।










