গান্ধী জয়ন্তীতে সম্রাট চৌধুরীর ঘোষণা ৩৮ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১০ টাকা ফি, বর্জ্য থেকে ৫০ কোটি আয়ের লক্ষ্য

গান্ধী জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী বিহারের ৩৮টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১০ টাকা ফি, পাটনার বর্জ্য থেকে ৫০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য, কৃষি ফিডারের সৌরায়নে ৫,৫০০ কোটি টাকা অনুদান এবং গ্রীন হাইড্রোজেন নীতির কথা জানান।
গান্ধী জয়ন্তীতে সম্রাট চৌধুরীর ঘোষণা ৩৮ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১০ টাকা ফি, বর্জ্য থেকে ৫০ কোটি আয়ের লক্ষ্য
Photo Credit / Attribution: Google

পাটনায় গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী শিক্ষা, পরিবেশ, জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের কথা জানান। বাপু টাওয়ারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিহারের সব ৩৮টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ১০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাটনার বর্জ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কৃষি ফিডারগুলিকে সৌরশক্তির সঙ্গে যুক্ত করার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫,৫০০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মজয়ন্তী এবং বাপু টাওয়ারের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের কাজের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা সহজলভ্য করা, শহরের বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা, কৃষকদের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিকল্প ব্যবহারের বিষয়গুলি উঠে আসে।

ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিহারের সব ৩৮টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ১০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিহার সরকার এর আগে এই ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এ মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছিল, বিহারে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার এক বছরের ফি মাত্র ১০ টাকা। ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক বছরের জন্য পাঁচ টাকা ফি নেওয়া হয়।

এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য সরকারি প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের জন্য কম খরচে উপলব্ধ করা বলে জানানো হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শিক্ষাগত ফি ছাড়াও হোস্টেল, খাবার, বই, যাতায়াত, পরীক্ষা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ থাকতে পারে। ফলে ১০ টাকার ফি মূলত নির্ধারিত শিক্ষাগত ফি-র সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষার্থীদের মোট খরচ বুঝতে অন্যান্য খরচের বিষয়গুলি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রী পাটনার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও লক্ষ্য ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, শহর থেকে উৎপন্ন বর্জ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, বর্জ্যকে শুধু শহর থেকে সরিয়ে নিষ্পত্তি করার পরিবর্তে তার ব্যবহারযোগ্য অংশকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের দিকে কাজ করা হবে।

পাটনার মতো বড় শহরে প্রতিদিন বাড়ি, বাজার, দোকান, অফিস এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এই বর্জ্যের মধ্যে জৈব পদার্থের পাশাপাশি প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু এবং অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী থাকে। উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথক করা এবং পরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণ করা হলে বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। সরকারের পরিকল্পনা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে আয় করার লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত।

বর্জ্য থেকে সম্ভাব্য আয় শুধু পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এর মাধ্যমে পুরসভাগুলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচের ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্জ্য থেকে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজস্ব তৈরির ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে শহরের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক মডেলের সঙ্গেও যুক্ত করা যেতে পারে। তবে ৫০ কোটি টাকার লক্ষ্য অর্জনে কোন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেগুলি থেকে প্রকৃত আয় কত হবে, তা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।

মুখ্যমন্ত্রী জ্বালানি ক্ষেত্রে কৃষি ফিডারের সৌরায়নের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, কৃষি ফিডারের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫,৫০০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। কৃষি ফিডারগুলিকে সৌরশক্তির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হিসেবে কৃষকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নত করা এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে সরকারি খরচ কমানোর কথা জানানো হয়েছে।

কৃষি ফিডার বলতে সেই বিদ্যুৎ লাইনগুলিকে বোঝায়, যেগুলির মাধ্যমে মূলত কৃষি পাম্প এবং সেচের সঙ্গে যুক্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। কৃষিকাজে বিদ্যুতের প্রাপ্যতার সঙ্গে সেচ ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কৃষি ফিডারগুলিকে সৌরশক্তির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকারের মতে, এর ফলে কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা হবে এবং প্রচলিত জ্বালানি উৎসের খরচ কমানোর দিকেও কাজ করা যাবে।

অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের গ্রীন হাইড্রোজেন নীতির কথাও উল্লেখ করেন। গ্রীন হাইড্রোজেনকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ক্ষেত্রে একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর উৎপাদনে পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। বিহার সরকারের পক্ষ থেকে গ্রীন হাইড্রোজেন সংক্রান্ত নীতি তৈরির কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জ্বালানি ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন বিকল্প ব্যবহারের দিকে রাজ্যের উদ্যোগের কথা বলেন।

শিক্ষা সংক্রান্ত আরেকটি বিষয় হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের মডেল স্কুলগুলির তথ্য জানান। তাঁর মতে, বিহারে ৭০০টি মডেল স্কুল পরিচালিত হচ্ছে এবং সেখানে প্রায় ৩.৫ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এই শিক্ষার্থীদের ‘বিদ্যার্থী সাথী অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা অনলাইন টিউটরের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য স্কুলের সময়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ডিজিটাল সহায়তা দেওয়া।

বিহার সরকার প্রযুক্তিগত শিক্ষার ক্ষেত্রে কম ফি-র ব্যবস্থার ওপর আগেও জোর দিয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এ মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছিল, বিহারে মাত্র ১০ টাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হচ্ছে। ওই অনুষ্ঠানেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষার্থীদের সুবিধা এবং হোস্টেল সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। কলেজ চত্বরের আশপাশে প্রধানমন্ত্রী জন ঔষধি কেন্দ্র খোলার দিকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আধিকারিকদের বলা হয়েছিল।

গান্ধী জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে শিক্ষা ও পরিবেশের পাশাপাশি গান্ধীর চিন্তাভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী মহাত্মা গান্ধীর সত্য, অহিংসা এবং সেবার আদর্শের উল্লেখ করেন এবং বর্তমান সময়ে সেগুলি অনুসরণ করার কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মজয়ন্তীতেও তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

বাপু টাওয়ারের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরও কয়েকটি কার্যক্রম হয়। মুখ্যমন্ত্রী বাপু টাওয়ারের ভূতলে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত সিরামিক শিল্পী ব্রহ্মদেব পণ্ডিতের তৈরি মহাত্মা গান্ধীর আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেন। বাপু টাওয়ারে আসা দর্শনার্থীদের জন্য অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়। অনুষ্ঠানে ‘সত্যাগ্রহ’ পত্রিকার প্রকাশ করা হয়।

বাপু টাওয়ারকে মহাত্মা গান্ধীর জীবন, তাঁর চিন্তাভাবনা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ঘটনাগুলি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি দর্শনার্থীদের সুবিধার সঙ্গে যুক্ত। অনুষ্ঠানে গান্ধীবাদী চিন্তাভাবনা এবং পরিচ্ছন্নতার বার্তার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে পাটনার বাপু টাওয়ারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সৌরশক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলি উঠে আসে। ৩৮টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১০ টাকা ফি, পাটনার বর্জ্য থেকে ৫০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য, কৃষি ফিডারের সৌরায়নের জন্য ৫,৫০০ কোটি টাকা অনুদান এবং গ্রীন হাইড্রোজেন নীতির মতো বিষয় তাঁর বক্তব্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পরিকল্পনাগুলির বাস্তব ফলাফল তাদের বাস্তবায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ে উপলব্ধ সুবিধার ওপর নির্ভর করবে।

Leave a comment