বিহারশরিফ শহরে পঞ্চানে নদীর ওপর বসার বিঘা ও আশানগরের মধ্যে প্রস্তাবিত ফুটব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রায় ১.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া এই পদচারী সেতুর লক্ষ্য নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা।
বর্তমানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে স্থানীয় বাসিন্দাদের নদীর আশপাশের বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে যাতায়াতের দূরত্ব ও সময় দুটিই বেড়ে যায়। ফুটব্রিজ নির্মিত হলে বিশেষ করে পথচারীদের যাতায়াতে সুবিধা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং ছটপূজার সময় এই সেতুর গুরুত্ব আরও বাড়বে, কারণ পঞ্চানে নদীর ঘাটে পৌঁছনো ভক্তদের জন্য সরাসরি ও নিরাপদ পথ তৈরি হবে।
পঞ্চানে নদী বিহারশরিফ শহরের গুরুত্বপূর্ণ জলস্রোতগুলির একটি। নদীর আশপাশে শহরের বেশ কয়েকটি এলাকা গড়ে উঠেছে। বিহারশরিফ পুরনিগমের সরকারি সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত নথিতেও আশানগর এবং পঞ্চানে নদী-সংলগ্ন এলাকার উল্লেখ রয়েছে। ফলে নদীটি শহরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ভৌগোলিক সীমা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রস্তাবিত ফুটব্রিজটি মূলত পায়ে চলাচলকারী মানুষের ব্যবহারের জন্য তৈরি হবে। এ ধরনের সেতু সড়ক পরিবহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে সহায়তা করে। বসার বিঘা ও আশানগরের বাসিন্দাদের জন্য বাজার, ধর্মীয় স্থান, ঘাট এবং আশপাশের এলাকায় যাতায়াত সহজ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবীণ, মহিলা এবং শিশুদের দীর্ঘ পথ এড়িয়ে চলাচলে সুবিধা হতে পারে।
পঞ্চানে নদীর ওপর পদচারী সেতু নির্মাণ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে এর আগেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিহার আরবান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড অর্থাৎ BUIDCo ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চানে নদীর তীরে সূর্যমন্দিরের কাছে বিপরীত পাড়ের ঘাটগুলিকে সংযুক্তকারী পদচারী স্টিল ব্রিজের বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন বা DPR তৈরির জন্য দরপত্র জারি করেছিল। সরকারি নথিতে প্রস্তাবিত স্টিল ব্রিজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৩.৮ মিটার এবং প্রস্থ ২.১ মিটার উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে পঞ্চানে নদীর ওপর পদচারী যোগাযোগ শক্তিশালী করার পরিকল্পিত উদ্যোগের বিষয়টি উঠে আসে।
বসার বিঘা ও আশানগরের মধ্যে প্রস্তাবিত ফুটব্রিজকে স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। দুই এলাকার মধ্যে সরাসরি পদচারী যোগাযোগ তৈরি হলে নদীর চারপাশ ঘুরে বিকল্প পথে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। দৈনন্দিন ছোটখাটো কাজের জন্য যাতায়াতকারী মানুষের জন্যও এই সুবিধা কার্যকর হতে পারে।
এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছটপূজার সঙ্গে যুক্ত। পঞ্চানে নদীর ঘাটগুলিতে ছটের সময় বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়। ব্রতীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে পূজা ও আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং তাঁদের নদীর ঘাটে পৌঁছনোর জন্য নিরাপদ পথের প্রয়োজন হয়। ভিড় বাড়লে সরু রাস্তা ও সড়ক পরিবহনের কারণে সমস্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফুটব্রিজ থাকলে পথচারী ভক্তদের জন্য পৃথক পথ তৈরি হবে এবং মূল সড়কে ভিড়ের চাপও কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ছটপূজার সময় মহিলা ও প্রবীণ ব্রতীদের সংখ্যাও বেশি থাকে। ফলে নদীর ঘাটে পৌঁছনোর জন্য সুবিধাজনক পদচারী পথের গুরুত্ব বেড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা এই কারণেই সেতুটিকে ছট ব্রতীদের জন্য উপযোগী প্রকল্প হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তবে সুবিধা নির্ভর করবে সেতুর নির্মাণের মান, প্রস্থ, রেলিং, আলো এবং দুই প্রান্তে সংযোগকারী পথের ব্যবস্থার ওপর।
সেতু নির্মাণ শুধু নদীর ওপর কাঠামো তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুই প্রান্তে পৌঁছনোর রাস্তার মানও গুরুত্বপূর্ণ। ফুটব্রিজের দুই প্রান্তের পথ সরু বা জরাজীর্ণ থাকলে মানুষ সম্পূর্ণ সুবিধা পাবেন না। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, সেতুর পাশাপাশি অ্যাপ্রোচ রোড, আলো, রেলিং এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক সুবিধার দিকেও নজর দেওয়া হবে।
বর্ষাকালে নদীর জলস্তর বেড়ে গেলে নদী পারাপার আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন সময় স্থায়ী ও নিরাপদ সেতুর ব্যবহারিক গুরুত্ব বাড়ে। তবে সেতুর প্রকৃত নিরাপত্তা নদীর জলস্তর, নকশা এবং নির্মাণ মানের ওপর নির্ভর করবে। নির্মাণের সময় প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং নদীর সম্ভাব্য জলপ্রবাহ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হবে।
পঞ্চানে নদীর তীরবর্তী এলাকায় আরও বিস্তৃত উন্নয়ন পরিকল্পনাও রয়েছে। বিহারশরিফে পঞ্চানে নদীর রিভার ফ্রন্ট উন্নয়ন পরিকল্পনার অধীনে নদীর তীরবর্তী প্রায় ৮.২ কিলোমিটার এলাকায় উন্নয়ন কাজের প্রস্তাব সামনে এসেছিল। এই প্রকল্পে গ্রিন জোন এবং মানুষের বিনোদন ও ব্যায়াম সংক্রান্ত সুবিধা তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছিল।
নদীর তীরে মৌলিক পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ ছটের মতো বড় উৎসবের সময়ও কার্যকর হতে পারে। সম্প্রতি বিহারশরিফ পুরনিগমের পক্ষ থেকে আশানগরে পঞ্চানে নদীর তীরে ছট ঘাট নির্মাণের জন্যও দরপত্র জারি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জারি করা ওই দরপত্রে ওয়ার্ড নম্বর ৬-এ পঞ্চানে নদীর তীরে ছট ঘাট নির্মাণের আনুমানিক ব্যয় ১৭.২৮ লক্ষ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফুটব্রিজ নির্মিত হলে আশপাশের বাসিন্দাদের বাজার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবায় পৌঁছনো সহজ হতে পারে। নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে অল্প দূরত্বের জন্যও যদি সড়কপথে দীর্ঘ ঘুরপথ নিতে হয়, তাহলে সময় ও পরিশ্রম দুটিই বেশি লাগে। পদচারী সেতু তৈরি হলে এই দূরত্ব কমতে পারে। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং স্থানীয় দোকানদাররাও দৈনন্দিন যাতায়াতে এর সুবিধা পেতে পারেন।
বিহারশরিফে ইতিমধ্যেই একাধিক নগর পরিকাঠামো প্রকল্পের কাজ চলছে। স্মার্ট সিটির অধীনে ফ্লাইওভারের মতো বড় প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে এবং পঞ্চানে নদীর রিভার ফ্রন্টের মতো পরিকল্পনার কাজও এগিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পদচারী ফুটব্রিজকে শহরের স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ফুটব্রিজের নির্মাণ সময়মতো শেষ করা হোক এবং সাধারণ দিনের পাশাপাশি ছটের মতো বড় আয়োজনের সময়ও সেটিকে নিরাপদ ও সুবিধাজনক করা হোক। সেতুতে পর্যাপ্ত আলো, মজবুত রেলিং, পিছলে যাওয়া রোধের ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলে এর ব্যবহারিক সুবিধা বাড়বে। বিশেষ করে উৎসবের সময় একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষ নদীর দিকে যাওয়ায় পদচারী সেতুতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বসার বিঘা ও আশানগরের মধ্যে সরাসরি পদচারী যোগাযোগ তৈরি হলে দুই এলাকার মধ্যে যাতায়াতের দূরত্ব কমার আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই সেতু ভবিষ্যতে দৈনন্দিন যাতায়াতের পাশাপাশি ধর্মীয় আয়োজনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। ছটের সময় ব্রতী ও ভক্তদের নিরাপদ পথের সুবিধা হলে ঘাটে পৌঁছনো সহজ হবে এবং মূল সড়কে পথচারীদের ভিড়ের চাপও কমানো যেতে পারে।
এখন নজর রয়েছে প্রস্তাবিত ফুটব্রিজের নির্মাণ কবে শুরু হয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবে কীভাবে রূপ পায় তার ওপর। সেতুর দুই প্রান্তের সংযোগকারী পথ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও তৈরি করা হলে পঞ্চানে নদীর দুই পাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই সেতু দৈনন্দিন যাতায়াতের পাশাপাশি ছটপূজার প্রস্তুতিতেও কার্যকর হতে পারে।










