পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণ আন্দোলন-সংক্রান্ত পুরনো মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার পর এই গ্রেফতারি হয়।
শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার কালীঘাটের বাড়িতে সাংবাদিক বৈঠক করে জানান, নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তাঁর গোষ্ঠী নতুন কোনও প্রার্থী দেবে না এবং কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করবে। তাঁর গোষ্ঠীর প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্তকে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে সংহতির অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করে। কংগ্রেস নেতারা গ্রেফতারের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, গ্রেফতারিটি ২০০৭ সালের পুরনো একটি হত্যা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল।
কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম জমি অধিগ্রহণ আন্দোলন-সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। দলের দাবি, ২০০৭ সালের আন্দোলনকে ঘিরে তাঁর নাম এক ডজনেরও বেশি মামলায় রয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরের একটি হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বলে কংগ্রেস নেতারা জানিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কংগ্রেস নেতা সুভাষিষ ভট্টাচার্যকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশের কাছ থেকে প্রধানকে গ্রেফতার করা আটকানোর চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে।
কিছু প্রতিবেদনে প্রধানের গ্রেফতারিকে ২০০৭ সালের তিনটি হত্যা মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ইন্ডিয়া টুডে পুলিশ সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ২০০৭ সালের তিনটি হত্যা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে মামলার আইনি প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিবরণে পার্থক্য রয়েছে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে প্রধানের গ্রেফতারি নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি ঘটনাটিকে ‘ভোট চুরি’ এবং ‘নির্বাচন চুরি’ বলে অভিহিত করেন এবং বিরোধী প্রার্থীকে নিশানা করতে এজেন্সিগুলির কথিত অপব্যবহারের অভিযোগ করেন।
খড়্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা পোস্টে অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের ক্ষতি করছে। তিনি আরও বলেন, কংগ্রেস চাপের কাছে নত হবে না এবং বিরোধী দলগুলি একসঙ্গে রাজনৈতিকভাবে এর জবাব দেবে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও প্রধানের গ্রেফতারি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি ঘটনাটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’র পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন, বিজেপি অবাধ নির্বাচনে বিশ্বাস করে না। গান্ধী বলেন, এই পদক্ষেপের কারণে কংগ্রেস পিছিয়ে যাবে না।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালও গ্রেফতারি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, ১৯ বছর পুরনো মামলাকে ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রার্থীকে গ্রেফতার করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ।
এই অভিযোগগুলি কংগ্রেস নেতাদের রাজনৈতিক বক্তব্য; এগুলিকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
বিজেপি কংগ্রেসের রাজনৈতিক অভিযোগ খারিজ করেছে। উপলব্ধ প্রতিবেদনে দলটির বক্তব্য, পুলিশ পুরনো মামলায় আইনি প্রক্রিয়া মেনেই ব্যবস্থা নিয়েছে এবং গ্রেফতারের সঙ্গে নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করা যথাযথ নয়।
ফলে গ্রেফতারির বিষয়ে দুই পক্ষের পৃথক দাবি রয়েছে। কংগ্রেস গ্রেফতারের সময় ও নির্বাচনী প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, আর বিজেপি এটিকে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও মিলন প্রধানের গ্রেফতারের সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি পুরনো মামলা হঠাৎ সামনে আনার অভিযোগ করেন এবং ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সঙ্গে যুক্ত করেন। এই অভিযোগের সমর্থনে এখনও কোনও বিচারিক সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন ৬ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই আসন থেকেই জয়ী হয়েছিলেন। পরে তিনি নন্দীগ্রাম আসন ছেড়ে ভবানীপুর আসন ধরে রাখেন, যার ফলে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বিজেপি নন্দীগ্রাম থেকে হসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে। তিনি শুভেন্দু অধিকারীর প্রয়াত সহযোগী চন্দ্রনাথ রথের মা। বামফ্রন্ট, ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেসের একটি পৃথক গোষ্ঠীও প্রার্থী দিয়েছে।
শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন থেকে নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখের এক দিন আগে এই ঘটনাগুলি ঘটে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে ভোট হবে ৬ অক্টোবর ২০২৬ এবং ভোট গণনার তারিখ ৯ অক্টোবর নির্ধারিত হয়েছে।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের প্রভাব দলীয় নাম ও নির্বাচনী প্রতীকের ওপরও পড়েছে। নির্বাচন কমিশন দুই গোষ্ঠীকে পৃথক নাম ও প্রতীক বরাদ্দ করেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল প্লেয়ার’ প্রতীক দেওয়া হয়েছে। অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘এনভেলপ’ প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন এবং এটিকে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগ নিয়ে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়া ও আইনি চ্যালেঞ্জের ফলেই পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
মিলন প্রধানের গ্রেফতারের পর নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কংগ্রেস গ্রেফতারের প্রতিবাদ করেছে এবং বিজেপি এটিকে আইন অনুযায়ী নেওয়া পদক্ষেপ বলে দাবি করেছে।
প্রধানের জামিন, আদালতের কার্যক্রম এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর গ্রেফতারের প্রভাব পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হবে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের জন্য ৬ অক্টোবর ২০২৬ ভোটের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।









