শহরের কোলাহল থেকে দূরে, জঙ্গলের নিস্তব্ধতার মধ্যে এমন একটি গ্রাম রয়েছে, যার বাসিন্দার সংখ্যা শুনলে অবাক হতে হয়। বীরভূমের চাঁদপুরে থাকেন মাত্র ১৬ জন মানুষ, আর তাঁরা প্রত্যেকেই একই পরিবারের সদস্য। সরকারি নথিতে স্বতন্ত্র গ্রামের পরিচয় থাকলেও ভৌগোলিক পরিসর খুবই ছোট। এই অচেনা জনপদের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বর্ধমানের রাজাদের সময়ের একটি কাহিনি এবং বংশপরম্পরায় পালন করে আসা বিশেষ দায়িত্ব।
কোথায় রয়েছে এই অচেনা গ্রাম?
বীরভূমের সিউড়ি শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদপুর গ্রাম। সিউড়ি-১ ব্লকের নগরী পঞ্চায়েত এলাকার পাথরচাপুড়ি মাজার পেরিয়ে জঙ্গলের ভিতরে কিছুটা এগোলেই দেখা মেলে এই জনপদের নাম লেখা একটি সাইনবোর্ডের।
প্রথমবার সেখানে গেলে চোখে পড়বে রাস্তার ধারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বাড়ি। কিছুটা দূরেই রয়েছে একটি ছোট মাজার। এই সামান্য পরিসর নিয়েই গড়ে উঠেছে চাঁদপুরের বসতি। গ্রামের বাসিন্দাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড-সহ বিভিন্ন সরকারি পরিচয়পত্রেও ঠিকানা হিসেবে চাঁদপুরের নাম উল্লেখ রয়েছে।
মাত্র ১৬ জন বাসিন্দা, প্রত্যেকেই একই পরিবারের
চাঁদপুরের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, এখানে বসবাস করেন মাত্র ১৬ জন। আর এই বাসিন্দারা সবাই একই পরিবারের সদস্য। সাধারণ গ্রামের মতো এখানে একাধিক পরিবারের বসতি বা বিস্তৃত জনবসতি নেই। দুটি বাড়ি ও মাজারকে কেন্দ্র করেই গ্রামটির পরিচিতি।
চারপাশের জঙ্গলের মধ্যে এই ছোট্ট জনপদ যেন আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে অনেকটাই আলাদা। তবে এর অস্তিত্ব কেবল বিচ্ছিন্ন বসতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ইতিহাস ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ঐতিহ্য।
বর্ধমানের রাজাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামের ইতিহাস
পরিবারের প্রবীণ সদস্য শেখ আব্দুল ফিরোজের বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় বর্ধমানের রাজারা তাঁর ঠাকুরদা আব্দুল হামিদকে জঙ্গলঘেরা এই জমি দান করেছিলেন। তবে জমি পাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি শর্ত।
বংশপরম্পরায় ওই এলাকার মাজারে প্রতিদিন বাতি জ্বালানোর দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেই আব্দুল হামিদের দুই ছেলে মাজারের কাছাকাছি দুটি আলাদা বসতি গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে সেই বসতিই চাঁদপুর নামে পরিচিতি পায়।
কেন বাড়েনি গ্রামের পরিসর?
চাঁদপুরের চারপাশের এলাকা বন দফতরের অধীন বলে সেখানে নতুন করে বাড়ি তৈরি করার অনুমতি নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সময়ের সঙ্গে গ্রামের পরিসর বাড়েনি। পাশাপাশি, বাইরের মানুষের নতুন বসতি গড়ে ওঠার সুযোগও সীমিত থেকেছে।
এই কারণেই দুটি বাড়ি ও একটি মাজারকে ঘিরে চাঁদপুরের স্বতন্ত্র পরিচয় আজও বজায় রয়েছে। জনসংখ্যা কম হলেও সরকারি নথিতে গ্রামটির অস্তিত্ব রয়েছে, যা এই জনপদকে আরও ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে মাজারে বাতি জ্বালানোর রীতি
পরিবারের প্রবীণ সদস্য শেখ আব্দুল ফিরোজ জানিয়েছেন, পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই দায়িত্ব তাঁরা যতদিন সম্ভব পালন করে যেতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের সহযোগিতাও তাঁরা পেয়ে থাকেন।
দিনের বেলায় আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই ছোট্ট গ্রাম ও মাজার দেখতে আসেন। জঙ্গলের নিস্তব্ধ পরিবেশ, মাত্র ১৬ জনের বসতি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পারিবারিক ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে চাঁদপুর কৌতূহলী মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
তবে আগামী প্রজন্মও একই নিষ্ঠায় এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে পরিবারের প্রবীণদের মনে প্রশ্ন রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও পূর্বপুরুষদের দায়িত্বকে ধরে রাখার চেষ্টা করাই এই গ্রামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় রয়েছে এক আশ্চর্য গ্রাম, নাম চাঁদপুর। সিউড়ি শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এই জনপদের বাসিন্দা মাত্র ১৬ জন। তাঁদের প্রত্যেকেই একই পরিবারের সদস্য। পাশাপাশি থাকা দুটি বাড়ি ও একটি ছোট মাজারকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই গ্রামের পরিচয়। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া মাজারে প্রতিদিন প্রদীপ জ্বালানোর দায়িত্ব আজও পালন করে চলেছেন পরিবারের সদস্যরা।













