পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার বিজেপি সরকার ৯ মে শপথ গ্রহণ করবে, ২০২৬ নির্বাচনে একাধিক রাজ্যে ফলাফল পরিবর্তন

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি প্রথমবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পথে। অসমে বিজেপি টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরেছে, তামিলনাড়ুতে টিভিকে বৃহত্তম দল হয়েছে, কেরলে ইউডিএফ ক্ষমতায় ফিরেছে এবং পুদুচেরিতে এনডিএ সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, কেরল এবং পুদুচেরি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এনেছে। পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবার পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে। দলটি ২০৬টি আসন জিতে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের প্রাধান্য শেষ করেছে।

দলীয় সূত্র অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ ৯ মে অনুষ্ঠিত হবে। এই দিনটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রাজ্য বিজেপি সভাপতি সমীক ভট্টাচার্য এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ৯ মে নির্ধারিত হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক গুরুত্বের সঙ্গেও যুক্ত। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে অনুষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বিধায়ক দলনেতা নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক নিযুক্ত করা হয়েছে। ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝিকে সহ-পর্যবেক্ষক করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি প্রথমবার সরকার গঠন করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল দলের দীর্ঘমেয়াদি সংগঠনগত কৌশল ও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের ফল। বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, এই জয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের কৌশল, কর্মীদের প্রচেষ্টা এবং জনসমর্থনের ফল।

নির্বাচনের ফলাফলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে পরাজিত হয়েছেন। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী তাকে পরাজিত করেছেন। ফলাফলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন যে একাধিক আসনে “ভোট লুট” হয়েছে এবং তাদের এজেন্টদের বুথে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তবে দলের কিছু নেতা জনাদেশ মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, জনগণের সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ এবং যদি বাংলার মানুষ বিজেপিকে বেছে নিয়ে থাকে, তবে তা সম্মান করা উচিত। তিনি আরও বলেছেন, তাদের দল গণতন্ত্র, সংবিধান এবং ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। দলের প্রচারক সায়নী ঘোষও বলেছেন যে দল জনতার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে।

অসমে বিজেপি টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দলটি রাজ্যে সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেট অর্জন করেছে এবং অধিকাংশ আসনে জয়লাভ করেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডাকে বিধায়ক দলনেতা নির্বাচনের জন্য পর্যবেক্ষক করা হয়েছে।

তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের দল তামিলগা ভেত্রি কাজাগম (টিভিকে) ১০৮টি আসন জিতে বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে। ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম ডিএমকে বা এআইএডিএমকের বাইরে অন্য কোনও দল সরকার গঠনের অবস্থানে এসেছে। বিজয়কে বিধায়ক দলনেতা নির্বাচিত করা হয়েছে এবং তার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে। তার পিতা এস.এ. চন্দ্রশেখর বলেছেন যে তিনি আগেই বিশ্বাস করেছিলেন তার ছেলে মুখ্যমন্ত্রী হবে।

কেরলে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন নিজের আসন ধরে রাখতে সক্ষম হলেও তার দল সিপিআই(এম) আসন হারিয়েছে। কংগ্রেস নেতা এ.কে. অ্যান্টনি বলেছেন যে সিপিআই(এম)-এর নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনসংযোগের অভাব তাদের পরাজয়ের কারণ।

পুদুচেরিতে এনডিএ জোট সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এআইএনআরসি, বিজেপি এবং সহযোগী দলগুলি মিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এন. রঙ্গাসামি পঞ্চমবার মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন।

ফরাক্কা আসনে কংগ্রেস প্রার্থী মোতাব শেখের জয় আলোচনায় রয়েছে। নির্বাচনের আগে তার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, পরে তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান। আদালতের হস্তক্ষেপে তার নাম পুনর্বহাল হয় এবং তিনি বিজেপি প্রার্থীকে ৮ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেন। এই ঘটনায় ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এই ফলাফলের পর বিজেপি এবং এনডিএ-র রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে দল বা তার সহযোগীরা ক্ষমতায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুর ফলাফল জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলেছে। বিরোধী দলগুলির সামনে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সামনে আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, শিল্প, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলিতে কাজ করার দায়িত্ব রয়েছে। সমীক ভট্টাচার্য বলেছেন যে দলের লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা। 

 

 

Leave a comment