শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে, উত্তরবঙ্গের গভীর জঙ্গলের মাঝে বছরের শুরুতেই দুর্গাপুজোর আয়োজন—শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। শিলিগুড়ি শহর সংলগ্ন বৈকণ্ঠপুর জঙ্গলের দিল্লি ভিটা চাঁদের খাল এলাকায় প্রতি বছর পৌষ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ধুমধাম করে পালিত হয় বন দুর্গা পুজো। প্রকৃতির কোলে মহাদেবীর এই আরাধনা ভক্তদের কাছে এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
জঙ্গলের গভীরে পবিত্র তীর্থক্ষেত্র
বৈকণ্ঠপুর জঙ্গলের গভীরে অবস্থিত বন দুর্গা মন্দির বহু বছর ধরেই ভক্তদের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। জঙ্গলঘেরা নির্জন পরিবেশে দেবীর আরাধনায় আলাদা এক আবেগ ও বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। বছরের শুরুতেই এই পুজো দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা এখানে ছুটে আসেন।
লোককথা ও ইতিহাসে বন দুর্গা
লোককথা অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠক করতোয়া নদীপথে নৌকাযোগে এই এলাকায় আসতেন এবং এই অঞ্চল ছিল তাঁদের গোপন আস্তানা। সেই সময় দেবী ‘ঠুনঠুনি মা’ নামে পূজিত হতেন। পরবর্তীকালে এই আরাধনাই বন দুর্গা পুজো হিসেবে পরিচিতি পায়। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসেও এই অঞ্চলের ছায়া পাওয়া যায়।
রাজবংশী সমাজের হাত ধরে সূচনা
প্রথমদিকে স্থানীয় রাজবংশী সম্প্রদায়ের উদ্যোগেই বন দুর্গা পুজোর সূচনা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি পুজো কমিটি গঠিত হয় এবং নিয়মিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে পুজোর আয়োজন শুরু হয়। চলতি বছরে এই ঐতিহ্যবাহী পুজো ৪৫ বছরে পা দিল, যা ঘিরে ভক্ত ও আয়োজকদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিভিন্ন জেলা ও রাজ্য থেকে ভক্তসমাগম
রাজগঞ্জের বৈকণ্ঠপুর জঙ্গলে অবস্থিত এই মন্দিরে পুজোর সময় জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কোচবিহার ছাড়াও প্রতিবেশী রাজ্য অসম ও অন্যান্য রাজ্য থেকে বহু ভক্ত আসেন। পুজো কমিটির সম্পাদক রাজু সাহা জানিয়েছেন, ২ তারিখ রাতে মূল পুজো এবং ৩ তারিখ প্রসাদ বিতরণ করা হবে।
দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি
ভক্তদের জন্য মন্দির খোলা থাকবে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টে পর্যন্ত। সারা বছর পূর্ণিমা তিথিতেও এখানে ছোট পরিসরে পুজো অনুষ্ঠিত হয়, তবে পৌষ পূর্ণিমার পুজোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বন দফতরের কড়া বিধিনিষেধ
ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এ বছর একাধিক বিধিনিষেধ জারি করেছে বন দফতর।
২ জানুয়ারি: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টে
৩ জানুয়ারি: সকাল ৬টা থেকে দুপুর ৩টে
এই সময়ের মধ্যেই ভক্তরা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেন।
পুজোর রাতে শুধুমাত্র পুজো কমিটির সদস্যদের উপস্থিতির অনুমতি থাকবে। জঙ্গলের ভিতরে কোনও মেলা বসছে না। চারচাকা গাড়ির প্রবেশ নিষিদ্ধ, তবে টোটো, সাইকেল ও মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
নতুন বছরের শুরুতেই উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি সংলগ্ন বৈকণ্ঠপুর জঙ্গলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বন দুর্গা পুজো। পৌষ পূর্ণিমায় গভীর অরণ্যের মাঝে দেবী আরাধনাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের ঢল নামে। তবে এ বছর ভিড় ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নির্দিষ্ট সময়সূচি ও কড়া বিধিনিষেধ জারি করেছে বন দফতর।













