চাঁদপাল ঘাটের ইতিহাস লুকিয়ে বাঁকুড়ার সোমসারে! দামোদরের তীরে ২৫০ বছরের রাজবাড়ি আজও বহন করছে অতীতের গৌরব

কলকাতার চাঁদপাল ঘাটের সঙ্গে কী সম্পর্ক বাঁকুড়ার সোমসার গ্রামের? জানুন চন্দ্রমোহন পালের ইতিহাস, ২৫০ বছরের রাজবাড়ি, জমিদারি ঐতিহ্য এবং পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার সম্পূর্ণ গল্প।

কলকাতার অন্যতম পরিচিত নদীঘাট চাঁদপাল ঘাট প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতের সাক্ষী। কিন্তু এই ঘাটের নামকরণের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে বাঁকুড়ার ইন্দাস ব্লকের সোমসার গ্রামের এক বনেদি পরিবারের ইতিহাস। প্রায় আড়াইশো বছর আগের সেই অধ্যায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে দামোদরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজবাড়ি ও তার ঐতিহ্যে।

চাঁদপাল ঘাটের নামের নেপথ্যে যাঁর অবদান

ইতিহাস বলছে, খ্যাতনামা বস্ত্র ব্যবসায়ী চন্দ্রমোহন পাল বিদেশি কাপড়ের ব্যবসার সূত্রে নিয়মিত কলকাতায় যাতায়াত করতেন। ব্যবসার সুবিধার্থে তিনি গঙ্গার তীরে একটি ঘাট নির্মাণ করেন। সময়ের সঙ্গে সেই ঘাটই মানুষের মুখে মুখে চাঁদপাল ঘাট নামে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং আজও কলকাতার অন্যতম ঐতিহাসিক নদীঘাট হিসেবে নিজের পরিচয় ধরে রেখেছে।

বাঁকুড়ার সোমসারে জমিদারির সূচনা

চন্দ্রমোহন পাল পরবর্তীকালে তৎকালীন বর্ধমান রাজপরিবারের কাছ থেকে ইন্দাস অঞ্চলের ছয়টি মৌজা ক্রয় করেন। এরপর দামোদর ও শালি নদীর মোহনার কাছে সোমসার গ্রামে গড়ে ওঠে পাল পরিবারের জমিদারি। নদীর তীরে নির্মিত বিশাল রাজবাড়ি একসময় এলাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ঐশ্বর্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।

দুর্গাপুজো ঘিরে ছিল রাজকীয় ঐতিহ্য

ব্যবসার কারণে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য কলকাতায় থাকলেও দুর্গাপুজোর সময় তাঁরা নিয়ম করে সোমসারে ফিরতেন। নতুন পোশাক নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হত, পাশাপাশি চলত যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, রামলীলা, নহবত এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কয়েক দিনের জন্য গোটা অঞ্চল উৎসবের আবহে মুখর হয়ে উঠত।

আজও ইতিহাসের সাক্ষী ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ি

সময়ের সঙ্গে জমিদারি প্রথার অবসান হয়েছে, ব্যবসার জৌলুসও আর নেই। তবু সোমসারের প্রাচীন রাজবাড়ি, নাটমন্দির এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য আজও অতীতের সেই গৌরবময় দিনের স্মৃতি বহন করছে। প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় পাল পরিবারের উত্তরসূরিরা পূর্বপুরুষের ভিটেতে ফিরে এসে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।

ঐতিহাসিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

দামোদরের শান্ত পরিবেশ, শালি নদীর মোহনা এবং প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে সোমসার ধীরে ধীরে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ইতিহাস, প্রকৃতি ও বাংলার বনেদি সংস্কৃতির অনন্য সমন্বয় এই গ্রামকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ হেরিটেজ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কলকাতার ঐতিহাসিক চাঁদপাল ঘাটের সঙ্গে যে বাঁকুড়ার সোমসার গ্রামের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা অনেকেরই অজানা। ব্যবসায়ী চন্দ্রমোহন পালের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই ইতিহাস আজও জীবন্ত হয়ে রয়েছে দামোদরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন রাজবাড়ি, নাটমন্দির এবং জমিদারির নানা স্মৃতিচিহ্নে।

Leave a comment