ধর্ষণ মামলায় ১০ বছরের শিশুর জন্য বিচারকের ‘ক্যারেজ নোট’, দুই সপ্তাহে পৌঁছে দিতে DLSA-কে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ

ধর্ষণ মামলায় ১০ বছরের শিশুর জন্য বিচারক রজনী রঙ্গার লেখা বিশেষ চিঠিকে ‘ক্যারেজ নোট’ হিসেবে উল্লেখ করে দুই সপ্তাহের মধ্যে শিশুটি বা তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে DLSA-কে নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট।

দিল্লির ট্রায়াল কোর্টের বিচারক রজনী রঙ্গা ধর্ষণের শিকার ১০ বছরের এক শিশুর জন্য রায় ঘোষণার পর একটি বিশেষ চিঠি লিখেছিলেন। দিল্লি হাইকোর্ট এই চিঠিকে ‘ক্যারেজ নোট’ বা সাহসের বার্তা হিসেবে উল্লেখ করে নর্থ-ওয়েস্ট দিল্লি জেলা লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি (DLSA)-কে দুই সপ্তাহের মধ্যে শিশুটি বা তার পরিবারের কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

ঘটনাটি ২৩ জুলাই ২০২৩ সালের। সেই সময় শিশুটির বয়স ছিল ৭ বছর। তার বাবা-মা সুমিত শক্যের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। শিশুটি অভিযুক্তকে ‘আঙ্কেল’ বলে ডাকত।

মামলার শুনানির সময় শিশুটি আদালতকে বলেছিল, অভিযুক্তকে ততক্ষণ জেলে রাখা হোক, যতক্ষণ না সে বৃদ্ধ হয়ে যায়। ট্রায়াল কোর্ট মামলায় অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে তার প্রাকৃতিক জীবনের বাকি সময় পর্যন্ত কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।

রায় ঘোষণার পর বিচারক রজনী রঙ্গা শিশুটির নামে একটি পৃথক চিঠি লেখেন। এতে আইনি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি শিশুটিকে মানসিকভাবে সহায়তা করা এবং তার সাহসকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

বিচারক রজনী রঙ্গা চিঠির শুরুতে ‘ডিয়ার চাইল্ড’ লিখেছিলেন। তিনি আদালতে এসে অভিযুক্তকে শনাক্ত করার জন্য শিশুটির সাহসের প্রশংসা করেন।

চিঠিতে বিচারক বলেন, শিশুটি ঘটনা সম্পর্কে নীরব না থেকে তার মাকে পুরো বিষয়টি জানিয়েছিল। এরপর আদালতেও সত্য বলেছিল। বিচারকের মতে, শিশুটির এই সাহস অভিযুক্তকে অন্য কোনো শিশুর ক্ষতি করা থেকে আটকাতে সাহায্য করেছে।

বিচারক শিশুটিকে আশ্বস্ত করেন যে আদালত তার কথা শুনেছে এবং তার সাহসকে মনে রাখা হবে।

চিঠিতে বিচারক সেই ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করেন, যাকে শিশুটি ‘আঙ্কেল’ বলে ডাকত। বিচারক লেখেন, আদালত শিশুটির কথা শুনেছে এবং দোষী ব্যক্তিকে তার জীবনের বাকি সময় জেলে থাকতে হবে।

চিঠি অনুযায়ী, দোষী জেলেই বৃদ্ধ হবে এবং সেখানেই তার জীবন শেষ হবে। সে শিশুটি, তার ছোট বোন বা অন্য কোনো শিশুর আর ক্ষতি করতে পারবে না।

আদালতে অভিযুক্তকে দীর্ঘ সময় জেলে রাখার যে কথা শিশুটি বলেছিল, এই বার্তাটি তার সেই উদ্বেগেরও জবাব হিসেবে দেখা হয়।

চিঠির শেষে বিচারক রজনী রঙ্গা শিশুটিকে তার ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দেওয়ার বার্তা দেন। তিনি তাকে স্কুলে যাওয়া, বন্ধু তৈরি করা, হাসা, খেলা এবং স্বপ্ন দেখার কথা বলেন।

এই বার্তার উদ্দেশ্য ছিল আদালতের কার্যক্রম এবং অপরাধের ঘটনার বাইরে শিশুটির ভবিষ্যতের দিকে তার মনোযোগ ফেরানো। বিচারক তাকে এই আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেন যে এখন তার নিজের জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।

মামলায় সুমিত শক্যকে POCSO আইনের অধীনে ১২ বছরের কম বয়সি শিশুর বিরুদ্ধে গুরুতর যৌন অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

ট্রায়াল কোর্ট তাকে প্রাকৃতিক জীবনের বাকি সময় পর্যন্ত কঠোর কারাদণ্ডের সাজা দেয়। এর পাশাপাশি তাকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানাও করা হয়।

অপরাধমূলক ভয় দেখানোর মামলাতেও তাকে ৫ বছরের কঠোর কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানার সাজা দেওয়া হয়। দুটি সাজা একই সঙ্গে চলবে।

আদালত নির্যাতিত শিশুটির জন্য ১০.৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণও নির্ধারণ করেছিল।

দিল্লি হাইকোর্ট জেলা লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির সচিবের কাছে শিশুটির জন্য নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ প্রদানের পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট চেয়েছে।

এর মাধ্যমে আদালত নির্ধারিত আর্থিক সহায়তা নির্যাতিত শিশুটির কাছে পৌঁছেছে কি না, তা স্পষ্ট করার প্রক্রিয়া এগোবে। বিচারক রজনী রঙ্গার চিঠিটিও শিশুটি বা তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব DLSA-কে দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্ট চিঠিটিকে শুধু বিচারিক আদেশের অংশ হিসেবে নয়, শিশুটির সাহসকে স্বীকৃতি দেওয়া একটি ‘ক্যারেজ নোট’ হিসেবে দেখেছে।

অন্যদিকে, দিল্লি হাইকোর্ট দোষীর সাজা অবিলম্বে স্থগিত করা এবং তাকে জামিন দেওয়ার আবেদন গ্রহণ করেনি। আদালত মামলায় উপলব্ধ প্রমাণও বিবেচনা করেছে, যার মধ্যে ফরেনসিক রিপোর্টসহ অন্যান্য প্রমাণ রয়েছে।

মামলার পরবর্তী শুনানি ৪ নভেম্বর ২০২৬-এ হওয়ার কথা। অন্যদিকে, অভিযুক্তের আপিল ২০ জানুয়ারি ২০২৭-এ তালিকাভুক্ত রয়েছে।

এইভাবে, একদিকে দোষসিদ্ধি ও সাজা চ্যালেঞ্জ করে আইনি আপিলের প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে নির্যাতিত শিশুর পুনর্বাসন এবং নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়গুলিও আদালতের নজরদারির মধ্যে রয়েছে।

শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের পরিস্থিতি দিল্লিতে একটি বিষয় হয়ে রয়েছে। উপলব্ধ NCRB তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দিল্লিতে POCSO-এর ১,৫৫৩টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল।

এই সংখ্যা দৈনিক গড়ে ৪টির বেশি মামলার সমান। তবে এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা ওই বছরে রিপোর্ট হওয়া মামলাগুলিকে নির্দেশ করে; এটিকে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সব অপরাধের প্রকৃত সংখ্যার সমান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

২০২৫ সালের NCRB রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি। তাই ২০২৫ সালের জন্য দিল্লিতে POCSO মামলার তুলনা বা সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান বর্তমানে উপলব্ধ নেই।

এই মামলা শুধু দোষীকে সাজা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিচারকের শিশুটির নামে লেখা চিঠি এবং ক্ষতিপূরণের ওপর নজরদারি এই বিষয়টি তুলে ধরে যে যৌন অপরাধের মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নির্যাতিতের পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিশুটির জন্য লেখা বার্তায় তার অতীতের ঘটনার পরিবর্তে ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, খেলা এবং স্বপ্ন দেখার মতো বার্তাগুলি তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে। এই মামলায় দিল্লি হাইকোর্টের চিঠি পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশও সেই প্রক্রিয়ার অংশ। এখন DLSA-কে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ‘ক্যারেজ নোট’ শিশুটি বা তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

Leave a comment