নেপালে ভারী বৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। মুস্তাং জেলায় রবিবার বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ভেঙে কালীগণ্ডকী নদীতে পড়ে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে বন্যা, ভূমিধস ও ভারী বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ২৭২টি দুর্যোগের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
নেপালে ভারী বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি গুরুতর রয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (NDRRMA)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা, ভূমিধস ও ভারী বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ২৭২টি ঘটনা ঘটেছে।
এই ঘটনাগুলিতে মোট ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ৪ জন নিখোঁজ এবং ২৬ জন আহত হয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯৭টি ভূমিধসের ঘটনা রয়েছে। ভূমিধস-সংক্রান্ত ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু, ৪ জনের নিখোঁজ এবং ৪ জনের আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
মুস্তাং জেলায় রবিবার ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। পাথর ও মাটির বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ঢাল বেয়ে নেমে সরাসরি কালীগণ্ডকী নদীতে পড়ে।
ঘটনার ভাইরাল ভিডিওতে ধ্বংসাবশেষ দ্রুত নদীর দিকে নেমে আসতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর নদীর অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টির সময় মাটি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে। এর ফলে সড়ক, সেতু এবং নদীর তীরে অবস্থিত বসতিগুলিও প্রভাবিত হতে পারে।
ভারী বৃষ্টির প্রভাব নেপালের নদীগুলির জলস্তরেও দেখা যাচ্ছে। নারায়ণী নদীতে জল বাড়ার পর নদীর তীরে বাঁধা একটি ক্রুজ শিপ তার অবস্থান থেকে ছুটে যায়।
জানা গেছে, বন্যার জলের চাপে জাহাজটি বেঁধে রাখা দড়ি ছিঁড়ে যায়। এরপর ক্রুজ শিপটি নদীর স্রোতের সঙ্গে প্রায় ১০০ মিটার ভেসে যায়।
ভেসে যাওয়ার সময় জাহাজটি একটি সেতুর পিলারে ধাক্কা মারে। ঘটনাটি নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং তীব্র স্রোতের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
চিতওয়ান জেলাতেও রবিবার সকালে বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এখানে নারায়ণী নদী এবং রিউ নদীর জলস্তর বিপদসীমার উপরে পৌঁছে যায়।
দেবঘাটে নারায়ণী নদীর জলস্তর ৯.২৩ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে বিপদসীমা ৯ মিটার। অর্থাৎ নদীর জলস্তর বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
একইভাবে রিউ নদীর জলস্তর ৩.৯২ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই নদীর বিপদসীমা ৩.৮ মিটার নির্ধারিত।
নদীগুলির জলস্তর বৃদ্ধির কারণে আশপাশের এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে।
চিতওয়ান জেলায় টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে ভূমিধস ও মাটি ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে একাধিক সড়কপথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ভূমিধসের কারণে সড়কে ধ্বংসাবশেষ জমে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় এই ধরনের ঘটনায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
নেপালের কর্ণালী প্রদেশেও ভূমিধসের কারণে হাইওয়েতে যান চলাচল প্রভাবিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সড়কে ধ্বংসাবশেষ এসে পড়ায় যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
নেপাল প্রায় এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার গুরুতর বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। এর আগে ২৬ আগস্ট ভোতেকোশী নদীতে বন্যা হয়েছিল।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ১,৪৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আর ৫,৫০০-র বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছে।
আগের বন্যার পর বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ অব্যাহত ছিল। এই পরিস্থিতিতে ফের ভারী বৃষ্টি ও বন্যার ঘটনা প্রভাবিত এলাকাগুলির জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
নেপালের বড় অংশ পাহাড়ি ও পার্বত্য ভূখণ্ডে অবস্থিত। বর্ষাকালে দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢালে মাটি ও পাথর সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
মুস্তাংয়ে পাহাড়ের অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যাওয়া এবং চিতওয়ানসহ অন্যান্য এলাকায় ভূমিধসের ঘটনাগুলি এই ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। টানা বৃষ্টির সময় সড়কপথ, সেতু এবং নদীর তীরে অবস্থিত এলাকাগুলিতে সতর্কতা প্রয়োজন।
২৪ ঘণ্টায় ২৭২টি দুর্যোগের ঘটনা সামনে আসার পর বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে কাজ করার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ত্রাণ ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলি। ভূমিধস-প্রভাবিত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধারকারী দল এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর যাতায়াতও প্রভাবিত হতে পারে।
নদীর জলস্তর বৃদ্ধির মধ্যে নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের জন্য জলস্তর, আবহাওয়া এবং ভূমিধসপ্রবণ এলাকাগুলির উপর নিয়মিত নজর রাখা প্রয়োজন।
নেপালে বৃষ্টি অব্যাহত থাকার মধ্যে মুস্তাং, চিতওয়ান এবং কর্ণালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা সামনে এসেছে। ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ এবং জননিরাপত্তা পুনর্বহাল করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।








